ব্যাক্তিত্ব

হিমলার: নাৎসি বাহিনীর অন্যতম বিকৃত ও হটকারী সদস্য

ব্যাক্তিত্ব শুক্রবার, ১১ অক্টোবর ২০১৯ ০১:৫৪:০৪

নাৎসি বাহিনীর সদস্যদের নৃশংসতার কথা কে না জানে? তাদের মধ্যে একজন অন্যতম নৃশংস ব্যক্তি ছিলো হেনরিক হিমলার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্বেই নাৎসি জার্মানিতে সর্বাপেক্ষা ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের একজন হয়ে উঠেন। হলোকস্টের জন্য সরাসরি অভিযুক্ত ব্যক্তিদের একজন হিসেবে তাঁকে চিহ্নিত করা হয়েছে।  হিটলারের পক্ষে হিমলার আইনস্যাটগ্রুপেন ও নির্যাতন কেন্দ্র গঠন করেন। কমপক্ষে ছয় মিলিয়ন ইহুদি, দুই থেকে পাঁচ লক্ষ রোমানীয়সহ প্রায় চৌদ্দ মিলিয়ন সাধারণ নাগরিকের হত্যাকাণ্ড তাঁরই প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় পরিচালিত হয়। যার অধিকাংশ ব্যক্তিই পোলীয় ও সোভিয়েত নাগরিক ছিলেন।

হেনরিক হিমলারের জন্ম হয় ১৯০০ সালের ৭ই অক্টোবর মিউনিখের কাছে এক নিষ্ঠাবান স্কুল শিক্ষকের পরিবারে। ভ্যাবেরিয়ার ল্যান্ডহাটের পড়াশোনা করে যোগদেন একাদশ ভ্যাবেরিয়ান পদাতিক বাহিনীতে শিক্ষানীতি কেরানি হিসেবে। প্রথম মহা যুদ্ধের পর দক্ষিণপন্থী প্রাক্তন সৈন্যদের সংগঠনে যোগ দিয়ে হিটলারের নজরে পড়েন তিনি।
 
 ১৯২৩ সালে যোগ দেন শুঁডিখানার অভ্যুত্থানে। ওই সময়েই তিনি খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠে রোহেমের। ১৯২৫ সালে তার সাহায্যে হন? নাৎসি দলের তাত্ত্বিক নেতা গ্রেখর স্ট্রেশারের সচিব।  সেখান থেকে হন নিন্ম ভ্যাবিরিয়ারের জেলা নেতা। ১৯২৬ সালে উত্তর ভ্যাবিরিয়ারেও। ১৯২৫ সাল থেকে ১৯৩০ সাল পর্যন্ত ছিলো নাৎসি পার্টির প্রচার প্রধান।
 
১৯২৮ সালে পশ্চিম প্রাশিয়ার বড় জমিদার কন্যা মর্গারেট বোডেনকে বিয়ে করেন তিনি।  এই মর্গারেট ছিলো তার চেয়ে সাত বছরের বড় ও নানান বিষয়ে অভিজ্ঞ। তার আকর্ষণ ছিলো হোমিওপ্যাথি, মেসমেরিজম, আয়ুর্বেদ এমন ধরণের বিষয়ে।

হিমলার অবশ্য ইতিমধ্যেই বিভিন্ন নারী গর্ভে বহু সন্তানের জন্ম দিয়ে ফেলেছেন। তার আকর্ষণ বেশি ছিলো ইহুদি নারীদের প্রতি। তার যুক্তি ছিলো, "ইহুদি নারীদের গর্ভে যে আর্য বীজ তিনি রেখে যাচ্ছেন তার ফলে সমজের উপকার হবে।"

১৯২৮ সালে হিটলার তাকে তার দেহরক্ষী বা এস এস বাহিনীর প্রধান করে নেন। তিনশো জনের এই বাহিনীর দলটিকে তাদের ইউনিফর্মের রঙের কারণে বলা হলো ব্ল্যাক গার্ড। ১৯৩৩ সালের মধ্যেই এই বাহিনীর সদস্যা দাঁড়ালো প্রায় পঞ্চাশ হাজার।

 ১৯৩১ সাল থেকে ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত হিমলার চুপিচুপি তার নিজস্ব গুপ্তচর বাহিনী "এস ডি" গড়ে তুলেন। তাদের মারফত নাৎসি বাহিনী ও সরকারের সমস্ত উচ্চপদস্থ ব্যক্তির ভুল ত্রুটি বা দুর্বলতা সম্পর্কে রেকর্ড করা হয়। পরবর্তীকালে তার প্রয়োজনে এদের ব্ল্যাকমেল করেছে আর না হয় হিটলারের কানে তুলে দিয়ে তাদের দফারফা করেছে। হিটলারের হুকুমে হিমলার দাঢাউতে প্রথম বন্দিশিবির তৈরি করেন।
 
 ১৯৩৪ সালের ১০ই এপ্রিল হিমলার প্রাশিয়ার গেস্টাপোর ভারপ্রাপ্ত প্রধান নিযুক্ত হন। ওই বছরেরই ৩০শে জুন তার তৈরি করে রাখা "এস এ" নেতাদের ধরে ধরে রক্তাক্ত বিমোচন সম্পন্ন করেন। হিমলারের উপর হিটলার তার প্রাক্তন সহযোগীদের নিধনযজ্ঞে এতই সন্তুষ্ট হয়ে পড়েন যে তাকে এস এস ও গেস্টোপের সম্মিলিত বাহিনীর প্রধান করেন।
 
২য় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হবার মুখে  হিটলার তাকে জার্মানির বিশুদ্ধতা ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব দিয়ে সমগ্র আইন ব্যবস্থা, আমলাতন্ত্র, গোয়েন্দা ও পুলিশের একছত্র কর্তা করে দেন। দায়িত্ব পেয়ে হিমলার যেসব জাতী জার্মান রক্তের বিশুদ্ধতার বিপদ তাদের গ্রেপ্তার করে  বন্দিশিবিরে পাঠাতে শুরু করেন। নতুন করে আরো অনেক বন্দিশিবির তৈরী করতে থাকেন। হিমলার তিন ধরণের ব্যবস্থা করেন বন্দিদের জন্যে।
 
প্রথম দফাঃ
রুশ বা স্লাব, ইহুদি বা পোল ইত্যাদি জাতীগোষ্ঠি বন্দিদের পাঠানো হতো বিনা পারিশ্রমিক জার্মান ক্ষেত খামারের কাজে। অথবা বিমুক্ত শিবিরে কবর খোড়া বা বিভিন্ন শারীরিক পরিশ্রমের কাজে।

দ্বিতীয় দফাঃ
এরপর যারা বেচে থাকতো তাদের পাঠানো হতো হিমলার উদ্ভাবিত ল্যাবরেটরি গুলোতে গিনিপিগের পরিবর্তে পরীক্ষানিরীক্ষার কাজে।

তৃতীয় দফাঃ
যারা বেচে থাকতো বয়স্ক, শিশু ও নারী ও দুর্বলদের পাঠিয়ে দেওয়া হতো বিমুক্ত শিবিরের গ্যাস চেম্বারে। হিমলার বিশ্বস্ত আইখমান আবার এদের চামড়া থেকে গদির কভার যা এযাবতকালে পণ্ডশ্রম থেকে তৈরি হতো, তার বদলে ব্যবহার করা, মানুষের চর্বি থেকে সৌন্দর্য সাবান তৈরী শুরু করল ফ্রাউ গোয়েবেলসের মালিকানাধীন কোম্পানিতে। ফ্রাই গোয়েবেলসের আবার পছন্দ ছিলো নাইট ল্যাম্প ইত্যাদিতে শিশুদের হাড় ব্যবহার করা। এসব সরবরাহ করতো ফ্রাউ আইখমেন।

১৯৪৪ সালের ২১ শে জুলাই  যখন লালফৌজের অগ্রগতি শুরু হয়ে গেছে হিটলার তার উপর দায়িত্ব দিলো এক গনফৌজ তৈরী করার যা বার্লিনকে রক্ষা করবে। হিমলারকে করা হলো তার সর্বাধিনায়ক। এদের উপর দায়িত্ব দেওয়া রইলো যে বার্লিনের পতনের পরেও তারা উচ্চ ভ্যাবেরিয়া পার্বত্য অঞ্চলে জার্মানিরর পক্ষে যুদ্ধ চালিয়ে যাবে।

এই হুকুম পাওয়ার পর হিমলার বুঝে গেলো জার্মানির জয়ী হওয়ার আর কোনো সম্ভাবনা নেই। ১৯৪৫ সালের শুরুতে "আপন প্রান বাঁচা" এই আপ্তবাক্য অনুযায়ী নিজেকে বাঁচাতে মিত্র পক্ষের সাথে একটা সমঝোতায় আসার চেষ্টা একটা সুইডিশ মধ্যস্তকারী উইসবর্গের কাউন্ট ফক বার্নাডোটের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। জানালো, সে মিত্র পক্ষের শর্ত মানবে এমনকি সমস্ত বন্দি শিবির ও বিমুক্ত শিবির থেকে সব ইহুদিদের মুক্তি দিয়ে দেবে। জার্মান এজেন্টদের সম্পর্কে তার কাছে যা কাগজ পত্র আছে সব মিত্র পক্ষের হাতে তুলে দেবে।

এই খবর আর হিটলারের কাছে গোপন রইলোনা।হুকুম জারি করলো তখনি তাকে গ্রেপ্তার করে গুলি করে মারার। কিন্তু তখন কেই বা গ্রেপ্তার করবে কেই বা গুলি করবে।

১৯৪৫ সালে জার্মানফৌজ চুড়ান্ত আত্মসমর্পণ করলে হিমলার গোফ কামিয়ে চোখের উপর কালো ডাকনা লাগিয়ে হাইনরিখ হিটজিজ্ঞার নামে এক বরখাস্ত গেস্টাপোর ছদ্মবেশে ফ্লেনবুর্গ ছেড়ে পালায় কিন্তু ধরা পড়া যায় ব্রেমেনের উত্তর পূর্বে ব্রেমাবোর্ডেতে।

 ২৩ শে মে, লুনেবুর্গে মিত্র পক্ষের সামরিক ডাক্তার দ্বারা পরীক্ষা দেবার সময় মুখের ভেতর লুকিয়ে রাখা পটাশিয়াম সাইনাইডের আ্যম্পুল চিবিয়ে  আত্মহত্যা করেন হিমলার।

তথ্যসূত্রঃ https://www.britannica.com/biography/Heinrich-Himmler
    
লেখকঃ এস এম সজীব