ব্যাক্তিত্ব

তৈমুর লংঃ মধ্য এশিয়ার এক অপরাজেয় নৃপতি

ব্যাক্তিত্ব শনিবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ১০:১৬:৫৮

তৈমুর লঙ বা আমীর তৈমুর, যার হাতে নিহত হয়েছিল পৃথিবীর জনসংখ্যার শতকরা ৫ ভাগ সংখ্যার বিচারে যা ১৭ মিলিয়ন। তিমুরীয় সাম্রাজ্যের এই নেতার করায়ত্ত হয়েছিল প্রায় পুরো পৃথিবীর রাজত্ব। পারস্য দিয়ে জয়রথ শুরু হয়ে খোড়া পায়ের এই বিজেতা থামেন চীন জয় করার মধ্যপথে। মাঝখান দিয়ে ধ্বংস করে দেয়া হয় সভ্যতা, নির্বিচারে হত্যা করে দেয়া হয় নিরপরাধ জনগণকে। তার সমসাময়িক সময়ে ইউরোপে রাজ করছিলেন পরম ক্ষমতাশালী অটোমান সম্রাট বায়েজিদ। নিকোপলিসের ক্রুসেডের নায়ক এই সুলতানও তৈমুরের কাছে হার মানতে বাধ্য হোন। দিগ্বিজয়ী এই তাতার নেতার সাম্রাজ্য অধিকারের নেশা পেয়ে বসেছিল তার জীবনের পুরোটা সময়ব্যাপী। বিশ্বজয়ের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে যখন তিনি চেংগিস খানের মানচিত্র চোখের সামনে মেলে ধরেন তখন তার ওপর চেপে বসে বিশ্বনেতা হওয়ার স্বপ্ন। বেরিয়ে যান পৃথিবী দখলে।

১৩৩৬ সালে উজবেকিস্তানে জন্ম নেন আমির তৈমুর। শৈশবে এক দুর্ঘটনায় তৈমুর তার এক পা হারান। আর এজন্য ইতিহাসে তিনি লং হিসেবে পরিচিতি পান যার অর্থ ছিল খোড়া। তৈমুর তার শিশুকাল থেকেই বেশ দুরন্ত ও ডানপিটে স্বভাবের ছিলেন। তার দুরন্তপনা সেই শৈশবেই একজন দস্যুতে পরিণত করে তাকে। কিশোর বয়সে তৈমুর তার নেতৃত্বে গড়ে তুলেন এক ডাকাতদল। এই দল ইতস্তত বিক্ষিপ্তভাবে লুটপাট চালাত। জন্ম হিংস্র তৈমুর‍ যখন যৌবনে পদার্পণ করেন তখন তিনি আরো পরিণত। দস্যুবৃত্তি চলছে অবাধে। সে সময়ই একদিন ভেড়ার পাল লুট করতে গিয়ে দুর্ঘটনাবশত তৈমুর তার এক পা পঙ্গু করে ফেলেন। কিন্তু পঙ্গুত্ব তাকে দাবায়ে রাখতে পারেনি। খুব শীঘ্রই তৈমুর জড়িয়ে পড়েন ক্ষমতা দখলের যুদ্ধে। চতুর তৈমুর এখানে সফলও হন। ১৩৪৭ সালে মধ্য এশিয়ার নেতা আমির কাজগান স্থানীয় নেতা চাগতাই খানাতের সর্দার বরলদেকে হটিয়ে নিজে ক্ষমতা দখল করেন। কিন্তু ১৩৫৮ সালে তিনি এক আততায়ীর হাতে নিহত হোন। এরপরে ক্ষমতার সামনে চলে আসেন আরেক তাতার নেতা তুঘলক তিমুর। তুঘলক এবার বারলাস প্রদেশের দায়িত্ব দেন তৈমুর লং কে। তুঘলক বুঝে উঠতে পারলেন না তিনি নিজ হাতে খাল কেটে কুমির আনলেন। তৈমুর সুযোগ খুঁজতে থাকেন তুঘলককে হটানোর কিন্তু একটা সময়  তার পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে যায়। তুঘলক তৈমুরকে তার পদ থেকে অব্যাহতি প্রদান করেন। তৈমুর এবার হাত মেলান সেই আমির কাজগানের নাতি আমির হোসেইনের সাথে৷ হোসেনের বোনকে বিয়ে করে রাজনৈতিক বন্ধন আরো শক্তিশালী করেন তৈমুর লং। তারা দুজন মেলে এবার চূড়ান্তভাবে তুঘলক আমিরকে পরাজিত করে মধ্য এশিয়ার শাসন নিজেদের হাতে নিয়ে আসেন।  কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী ক্ষমতাপিপাসু তৈমুর উসখুস করতে লাগলেন।  হোসেনকে ক্ষমতার পট থেকে সরিয়ে নিজে একাই মধ্য এশিয়ার শাসন বাগিয়ে নিতে তার সামনে সুযোগও এসে পড়ে। তৈমুরের স্ত্রী মারা গেলে এবার হোসেনকে হত্যা করে মধ্য এশিয়ার অদ্বিতীয় অধিপতি বনে যান খোড়া পায়ের নেতা আমির তৈমুর। এবার সাম্রাজ্য বিস্তারে মনোযোগী হন তৈমুর। প্রথমেই থাবা মারেন পারস্যে। ১৩৮০ খ্রিস্টাব্দে খোরাসান অধিকারের লক্ষ্য নিয়ে তৈমুর লঙ পারস্য আক্রমণ করে বসেন। খোরাসানের শাসনকর্তা গিয়াসউদ্দিন পীর আলী যুদ্ধে পরাজিত হয়ে তৈমুরের নিকট বশ্যতা স্বীকার করেন। খোরাসান হস্তগত হওয়ার সাথে ধীরে ধীরে কাবুল, কান্দাহার, হিরাটও তৈমুরের অধীনে চলে আসে। অতঃপর সিস্তান রাজ্যের কালাত-ই-নাদিরী ও তুরশিজ দুর্গ দুইটি তৈমুর অবরোধ করেন। প্রবল প্রতিরোধের পর শেষ পর্যন্ত এ দুর্গ দুইটি তৈমুরের হস্তগত হয়। যার ফলে সিস্তানও তৈমুরের রাজ্যভুক্ত হয়ে পড়ে। ইস্পাহান শহরে তান্ডবলীলা চালিয়ে পারস্য সম্পূর্ণরূপে তার অধিকারে নিয়ে আসেন। দিগ্বিজয়ের নেশায় পেয়ে বসা তৈমুর লং ভারত আক্রমণ করেও বিপর্যস্ত করে দিয়েছিলে। তার কাছে হার মানতে হয়েছিল সমকালীন বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নৃপতি অটোমান সুলতান বায়েজিদকে। অঙ্গোরার যুদ্ধে তিমুরীয় বাহিনীর কাছে নাস্তানাবুদ হয়েছিল অটোমান সৈন্যরা। এই যুদ্ধের পর ফ্রান্স, স্পেন ইত্যাদি দেশ স্বপ্রণোদিত হয়ে তৈমুরের সাথে সন্ধিতে আবদ্ধ হয়। তার স্বীয় রণনীতির ফলে প্রায় অর্ধেক পৃথিবী তার আয়ত্তে এসেছিল।

পৃথিবীর ত্রাস তাতার অধিপতি তৈমুরকে পেয়ে বসেছিল চেংগিস খানের নেশা। চেয়েছিলেন বিশ্বজয় করতে। আর এর বাস্তবায়ন করতে তিনি পা বাড়ান চীনের পথে। ১৪০৫ সালে কাজাখস্তানের কাছে তিমুরীয় বাহিনী ভয়াবহ শীতের কবলে পড়ে। অবস্থা খুব বেগতিক হওয়ায় তৈমুরের ব্যক্তিগত চিকিৎসক পিছু হটার পরামর্শ দেন। কিন্তু একরোখা তৈমুর তাতে কর্ণপাত না করে সামনে এগিয়ে যেতে থাকেন।  অবশেষে শীতের কাছে পরাজিত হয়ে ইহলীলা সাঙ্গ করেন মধ্য এশিয়ার এই দস্যু নেতা। তার সমাধিতে এখনো তার জেগে উঠার হুমকি দিয়ে প্রোথিত আছে, "আমি যখন আবার জেগে উঠব পৃথিবী আমার ভয়ে প্রকম্পিত হবে"
লেখকঃ উবায়দুর রহমান রাজু