ব্যাক্তিত্ব

আবুল আব্বাস সাফফাহঃ নিষ্ঠুর এক শাসক

ব্যাক্তিত্ব বৃহস্পতিবার, ২০ জুন ২০১৯ ০৩:০৭:২৮

উমাইয়াদের সাথে রাজনৈতিকভাবে দীর্ঘ একটা সময় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মুসলিম বিশ্বে নতুন সাম্রাজ্য হিসেবে পাদপ্রদীপের আলোয় আসে আব্বাসীরা। বিপ্লব, বিদ্রোহ আর হত্যার স্বীকার আব্বাসীরা শেষ পর্যন্ত উমাইয়াদের পরাজিত করে ৭৫০ সালে মুসলিম বিশ্বের নেতা বনে যায়। ১২৫৮ সালে বাগদাদ আক্রমণের আগ পর্যন্ত আব্বাসী খলিফা পুরো বিশ্বের মুসলমানদের কাছে তুমুল সম্মানীয় ছিলেন। সেই সাম্রাজ্যের প্রথম শাসক কিন্তু এমন ছিলেন না৷ আবুল আব্বাস নামের আব্বাসী বংশের এ নেতা প্রথম আব্বাসী খলিফা হিসেবে স্বীকৃত। শাসন ক্ষমতায় তিনি ছিলেন নিষ্ঠুর এক খলিফা।  যিনি নিজেই তার নামে জুড়ে দিয়েছিলেন সাফফাহ, যার অর্থ ররক্তপিপাসু। আবুল আব্বাস আস সাফফাহ'র কাহিনী জানব আজ।

৭৪৯ সালের ৩০ অক্টোবর আবুল আব্বাস কুফার মসজিদে প্রথম আব্বাসী খলিফা হিসেবে ঘোষিত হোন। কিন্তু তখনো পর্যন্ত উমাইয়াদের উপর আব্বাসীদের চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়নি। পরের বছর জানুয়ারিতে জাবের যুদ্ধে দ্বিতীয় মারওয়ান পরাজিত হলে ৭৫০ সালে কুফার মসজিদে আবুল আব্বাসের নামে খুতবা পড়া হয়। ব্যক্তিগত জীবনে আবুল আব্বাস ছিলেন অধিক মাত্রায় সন্দেহপ্রবন৷ তিনি তার বিরোধীদের সহ্য করতে পারতেন না। আর এজন্য হেন উপায় নেই যা তিনি অবলম্বন করতেন না।নিজেকে ভয়ংকর হিসেবে প্রমাণ করতে তিনি তার নামে সাফফাহ উপাধি লাগান। যার অর্থ রক্তপিপাসু। ক্ষমতায় আরোহন করে তিনি তার প্রধান শত্রু উমাইয়াদের পৃথিবী থেকে বিদায় করে দেয়ার নীলনকশা অংকন করেন। আর এজন্য তিনি উমাইয়া নেতৃবৃন্দের একটি তালিকা তৈরি করেন। ৭৫০ সালের ২৫ জুন আব্বাসের সেনাপতি আব্দুল্লাহ ফিলিস্তিনের আবু ফুট্রুস নামক জায়গায় উমাইয়া বংশের ৮০ জন নেতাকে এক নৈশভোজের আমন্ত্রণ জানান। আপ্যায়ন শেষ হওয়ার সাথে সাথে আকস্মিক  সব উমাইয়া নেতাদের হত্যা করা হয়। এর কিছুদিন পর বসরায়ও একইভাবে আরো কিছু উমাইয়াদের হত্যা করা হয়। উমাইয়াদের নামনিশানা মুছে দিতে আবুল আব্বাস আরো নিষ্ঠুর হোন। উমাইয়াদের কবর পর্যন্ত ধ্বংস করা হয়, অপমান করা হয় মৃতদের। শুধুমাত্র মুয়াবিয়া এবং উমর বিন আবদুল আযীয এই কবর নিধনযজ্ঞ থেকে বেঁচে যান।

উমাইয়াদের প্রতি সাধারণ জনগণের ক্ষোভ ছিল৷ কিন্তু তারা আবুল আব্বাস এর এমন কর্মকাণ্ড মেনে নিতে পারেনি। ফলে উমাইয়াদের প্রতি সাধারণ জনগণ সহানুভূতিশীল হয়ে পড়ে। আর এই সুযোগে উমাইয়াদের অবশিষ্ট থাকা নেতৃবৃন্দ যারা আত্মগোপনে ছিল তারা সংগঠিত হয়ে পড়ে। উমাইয়ারা আবার শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে এমন আশংকায় এবার চতুর আবুল আব্বাস নতুন কূটকৌশলের আশ্রয় নেন। হযরত আলীর পরিবারের প্রতি সাধারণ জনগণের দুর্বলতাকে কাজে লাগান তিনি। কারবালার হত্যাকাণ্ডকে ব্যাপকভাবে প্রচার করে দোষ চাপান উমাইয়াদের প্রতি। যার ফলে জনগণের চিন্তাও পালটে যায়। পূর্বের সহানুভূতির জায়গা থেকে সরে এসে তারা উমাইয়াদের প্রতি আবার বিরাগভাজন হয়ে পড়ে৷ আর এই সুযোগ নিয়ে আবুল আব্বাস হিংস্রভাবে উমাইয়াদের দমন করতে থাকেন।

হযরত আলী তার রাজধানী কুফায় স্থানান্তর করেছিলেন। আর এজন্য তাকে চরম মূল্য দিতে হয়েছিল। সাফফাহ সাধারণ মানুষের আলী প্রীতিকে কাজে লাগিয়ে কুফায় নিজের রাজধানী স্থানান্তর করেন।পরবর্তীতে নিজের হাত শক্তিশালী করে হীরার অদূরে আল-আনবার নামক জায়গায় তার নতুন রাজধানী স্থাপন করেন। সেখানে তিনি আল হাশিমিয়া নামের একটি রাজপ্রসাদ নির্মাণ করেন। আল হাশিমিয়া আব্বাসী স্থাপত্যে এক অসাধারণ সংযোজন । নিজের হাত আরো শক্তিশালী করে তুলতে তিনি কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক পদে অনুগত লোকদের বসান।

আবুল আব্বাস ছিলেন অধিক মাত্রায় সন্দেহপ্রবন। শুধুমাত্র সন্দেহের বশে তিনি তার শত্রুকে দুনিয়া থেকে বিদায় করে দিতেন। এমনই ভাগ্য বরণ করতে হয় কেন্দ্রীয় উজির আবু সালমাকে। তিনি ছিলেন একজন অ-আব্বাসী ব্যক্তি। তার কর্মনৈপুণ্যে তিনি এই পদ অলংকৃত করেন। কিন্তু তাকে সহ্য করতে পারছিলেন না আবু মুসলিম নামের আরেক উজির পদ প্রত্যাশী। তিনি খলিফার কানে কুমন্ত্রণা দিতে থাকেন। আবু সালমাকে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হিসেবে প্রমাণ করতে থাকেন আবু মুসলিম। আর সাফফাহও সন্দেহের বশে আবু সালমাকে হত্যা করার জন্য এক আততায়ী ভাড়া করেন। রাতের আঁধারে আবু সালমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে আবুল আব্বাসের লেলিয়ে দেয়া গুণ্ডারা। সফল হোন আবু মুসলিম কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস আবু মুসলিমের ভাগ্যেও একই পরিনতি বরণ করতে হয়।

আবুল আব্বাসের পুরোটা জীবনই কেটে যায় হত্যা,  গুপ্তহত্যা, বিদ্রোহ দমন করে। যার জন্য সাম্রাজ্যের কাজে তিনি মনোনিবেশ করতে পারেননি। ৭৫৪ সালে মাত্র ৩০ বছর বয়সে চিকেন পক্সে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন আব্বাসী খিলাফতের প্রথম এই খলিফা।

লেখকঃ উবায়দুর রহমান রাজু