ব্যাক্তিত্ব

চারু মজুমদার : ভারতের নকশাল বাড়িয়া আন্দোলনের রূপকার

ব্যাক্তিত্ব বৃহস্পতিবার, ২০ জুন ২০১৯ ০৩:৪০:১০

পৃথিবীর যত বড় বড় পরিবর্তন বা সংস্কার হয়েছে তা কোন না কোন আন্দোলন/সংগ্রাম বা বিপ্লবের মধ্য দিয়েই সংগঠিত হয়েছে। আর এসব বিপ্লব হওয়ার পিছনে সংগঠকের ভূমিকায় যারা দায়িত্ব পালন করেছেন। তারা আন্দোলনের মত করেই নিজেদেরকেও ইতিহাসের পাতায় নিজের স্থান পাক্কা করেছেন। তবে সবসময়ই যে তারা নিজেদের কে সফল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে বিষয়টি এমন নয়। কখনো কখনো ব্যর্থতার ভিতর দিয়েও নিজেদের কে অমর করে রেখেছেন। তারা হয়ে আছেন হাজার হাজার তাজা বিপ্লবী প্রানের অনুপ্রেরণা। এমনই একজন বিপ্লবী হলেন উপমহাদেশর প্রখ্যাত বিপ্লবী "চারু মজুমদার"। তিনি ভারতে অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি আন্দোলন পরিচালনা করেন। যেটি নকশাল বাড়ি আন্দোলন হিসেবে পরিচিত। এই নকশাল বাড়ি আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য তিনি বিখ্যাত হয়ে আছেন। এই নকশাল বাড়ি আন্দোলন ছিল একটি কৃষক শ্রমিকদের আন্দোলন। কৃষক-শ্রমিকরা সমাজতান্ত্রিক আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে এই আন্দোলন সংগঠিত করেন। চারু মজুমদার এই আন্দোলনের অন্যতম অন্যতম নেতা হিসেবে সামনে থেকে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন।

নকশাল আন্দোলনের অঅন্যতম রূপকার চারু মজুমদার বর্তমান বাংলাদেশের রাজশাহী জেলার বানারী পাড়া গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। তবে তার পৈতৃক নিবাস ছিল ভারতের শিলিগুড়িতে। জন্মের পর কিছুকাল রাজশাহী অতিবাহিত করলেও পরবর্তীতে তিনি তার পৈতৃক নিবাস শিলিগুড়িতেই চলে যান। সেখানেই তার পড়াশুনার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। তিনি ১৯৩৩ সালে শিলিগুড়ি বালক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মেট্রিক পাশ করেন। তারপর তিনি পাবনা অডওয়ার্ড কলেজে কিছুকাল পড়াশুনা করেন। কলেজে অধ্যয়নকালেই তিনি সাম্যবাদ তথা বাম মতাদর্শের রাজনীতিতে অনুপ্রাণিত হন। এবং কিছু কিছু আন্দোলন সংগ্রামে যোগদান করতে শুরু করেন। এসময়ে জলপাইগুড়িতে তেভাগা আন্দোলন শুরু হলে তিনি কলেজ বর্জন করে এই আন্দোলনে যোগদান করেন।এই আন্দোলনে যোগদান করার জন্য তিনি ব্রিটিশ সরকারের রোশানলে পড়েন। ফলে ব্রিটিশ সরকার তার নামে গ্রেপ্তারী পরোয়ানা জারি করে। ফলে তিনি বাধ্য হয়ে নিজেকে আত্মগোপনে রাখেন। কিন্তু চারু মজুমদার কখনো দমে যাওয়ার পাত্র ছিলেন না। তিনি এই আত্মগোপন অবস্থায়ই ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য পদ লাভ করেন এবং গোপনে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে থাকেন।

তবে তিনি এভাবে বেশিদিন থাকতে পারেন নি। ফলে ১৯৪২ সালে জলপাইগুড়ির এক গ্রাম থেকে তিনি ব্রিটিশ সরকারের হাতে বন্দি হন। তিনি ২বছর জেল খাটার পর ১৯৪৪ সালে মুক্তিলাভ করেন। মুক্তি লাভ করার পর তিনি উত্তরবঙ্গে চলে যান এবং সেখানে শোষিত, বঞ্চিত চা শ্রমিকদের সংগঠিত করতে আত্মনিয়োগ করেন। তবে ১৯৪৮ সালে ভারতে কমিউনিস্ট পার্টিকে অবৈধ ঘোষণার পর তিনি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। তবে অল্পকিছুদিন পরেই তিনি ছাড়া পেয়ে যান। ছাড়া পাবার পর তিনি আবার চা শ্রমিকদের নিকট চলে যান এবং এই চা শ্রমিকদের নিয়ে ১৯৫৭ সালে নকশাল বাড়ির  কেষ্টপুরের চা মালিকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। এই বিদ্রোহ তত শক্তিশালী না হওয়ার করনে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় এবং চারু মজুমদার সহ অনেকে গ্রেপ্তার হন। তবে কিছুদিন পর ছাড়া পেলেও ১৯৬২ সালের ভারত-চীন যুদ্ধের সময় চীনের পক্ষে সমর্থন আনার অভিযোগ এনে তাকে পুনরায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ১৯৬৩ সালে তিনি মুক্তি লাভ করে বিধান সভা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। তবে তিনি জয় লাভ করতে ব্যর্থ হন। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের সময়েও তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে একই বছর তিনি মুক্তিও পেয়ে যান। তারপর তিনি সিপিআই(এম) নামক বাম সংগঠনের সাথে যুক্ত হয় এবং ১৯৬৭ সালের পশ্চিমবঙ্গের বিধান সভার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। তবে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে বামফ্রন্ট জয়লাভ করলেও সরকার গঠন নিয়ে সিপিআই এর সাথে মতানৈক্য দেখা দিলে তিনি সিপিআই ত্যাগ করেন এবং পুনরায় কৃষক-শ্রমিকদের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য নিজেকে নিয়োজিত করেন।

চারু মজুমদার যে কর্মের জন্য ইতিহাস বিখ্যাত হয়ে আছেন সেটি হল নকশাল বাড়িয়া আন্দোলন। এই নকশাল বাড়িয়া আন্দোলন গড়ে উঠেছিল ভারত চীন সীমান্তবর্তী এলাকা শিলিগুড়ির নকশাল বাড়িয়া নামক একটি স্থানে। এটি ছিল ১৯৬৭ সালের ২৫ শে মে, সেদিন নকশাল বাড়িয়ার বেঙ্গাইজোত গ্রামে কয়েক হাজার ভূমিহীন কৃষক জরো হয় অত্যাচারী ভূস্বামীদের বিরুদ্ধে লড়ার জন্য। তাদের স্লোগান ছিল লাঙল যার জমি তার। তাদের স্লোগানে কাপন ধরেছিল নকশাল বাড়িয়ার শোষণকারী ভূমি মালিকদের মনে। আর এই আন্দোলনের সংগঠকের ভূমিকায় সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন চারু মজুমদার, কানু স্যানাল, জঙ্গল সাঁওতাল। কৃষকদের এই আন্দোলন মোকাবেলা করার জন্য ভারতের রাষ্ট্রিয় পুলিশ বাহিনী বিপ্লবীদের বিরুদ্ধে আধুনিক সকল সমরাস্ত্র নিয়ে অবতীর্ণ হন। ফলে পুলিশ বিপ্লবীদের উপর নির্বিচারে গুলি বর্ষণ শুরু করে এতে কমপক্ষে ১১জন বিপ্লবী এবং ২জন শিশু নিহত হয়। ফলে কৃষকদের সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন সেখানেই ধুলিসাৎ হয়ে যায়। মুলত চারু মজুমদাররা চেয়েছিল চীনের আদলে ভারতেও কৃষকদের দিয়ে বিপ্লব করাতে। কিন্তু তিনি মাওসেতুং এরমত করে সফলতার মুখ দেখতে সক্ষম হন নি। তবে ভারতসহ সমগ্র পৃথিবীর বিপ্লবীদের কাছে এক অনন্য অনুপ্রেরণার নাম হিসেবে তিনি অমর হয়ে আছেন।

১৯৬৭ সালে পরিচালিত নকশাল আন্দোলন প্রাথমিকভাবে থেমে গেলেও এর প্রভাত পশ্চিমবঙ্গ,
অন্ধ্রপ্রদেশ, কেরালা ও উড়িষ্যায় ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করে।১৯৬৮-তে কানু সান্যাল, জঙ্গল সাঁওতাল, নাগি রেড্ডি প্রমুখের সহযোগিতায় তিনি কমিউনিস্ট কনসোলিডেশন গঠন করছিলেন। ১৯৬৯সালের ১ মে কলকাতা ময়দানে সিপিআই (এমএল) গঠনের কথা ঘোষণা। চারু মজুমদার এ দলের সভাপতি নির্বাচিত হন। এর পরেই আন্দোলনের মাধ্যমে তিনি সারা ভারতে একজন বিপ্লবী নেতারূপে পরিচিতি লাভ করেন। তার পরিচালিত নকশাল আন্দোলন কে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দান করার জন্য তিনি ভারতের নানা অঞ্চলে কার্যক্রম শুরু করেন। একসময় তার পরিচালিত সকল আন্দোলনই নকশাল আন্দোলন হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। তার এইসব আন্দোলনকে ভারত সরকার দেশদ্রোহী আন্দোলন হিসেবে ঘোষণা করেন এবং তার বিরুদ্ধে খতম পরিচালনা করে গ্রেপ্তারী পরোয়ানা জারি করেন। এর ফলশ্রুতি তে তিনি আত্মগোপনে চলে যান এবং এই অবস্থায়ই ১৯৭২ সালের ১৬ ই জুলাই কলকাতার একটি বাড়ি থেকে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে এবং ২৮ জুলাই পুলিশ হেফাজতেই তার মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর ব্যাপারে পুলিশের দাবি ছিল তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বরন করেছেন। তবে চারু মজুমদারের সহযোগী অন্যান্য বিপ্লবীদের অভিমত হল পুলিশই বিচার বহির্ভূতভাবে তাকে হত্যা করেছে।

তথ্য সূত্র

১.https://lalshongbad.wordpress.com/tag/%E0%A6%A8%E0%A6%95

২.https://www.bbc.com/bengali/news-40046336

৩.http://jonojibon.com/2018/01/21/%E0%A6%86%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A7%8B%E0%A6%B2%E0%A6%A8

৪.https://bn.m.wikipedia.org/wiki/%E0%A6%A8%E0%A6%95%E0%A6%B6%E0%A6%BE%E0%A6%B2_%E0%A6%86%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A7%8B%E0%A6%B2%E0%A6%A8

লেখকঃ সজীব মোল্লা