ব্যাক্তিত্ব

শারিরীক প্রতিবন্ধী হয়েও যেসব নারী হয়েছেন বিশ্বখ্যাত।

ব্যাক্তিত্ব শুক্রবার, ৩১ মে ২০১৯ ০৫:১৪:২১

প্রতিবন্ধী শব্দটা শুনলেই মানুষের মাঝে একটা ধারণা প্রথমেই মনের মধ্যে চলে আসে- না! তাদের দ্বারা কি আর সম্ভব!! একটা সময় পর্যন্ত সত্যিই প্রতিবন্ধীদের দ্বারা অনেক কিছু সম্ভব হয়ে উঠেনি। সমাজে একঘরে হয়ে থাকা, তাদেরকে কোন কিছু করতে না দেয়া, স্বাভাবিক জীবন যাপনে উৎসাহিত না করা এর অন্যতম কারণ। বর্তমান আধুনিক সভ্যতার যুগে এই দ্বারা পরিবর্তন ঘটেছে অনেক। শারিরীক প্রতিবন্ধীদের জন্য এখনো পর্যাপ্ত সমতা সৃষ্টি করা না গেলেও তাদের জন্য বিশেষ সুবিধা প্রধান প্রকল্পে তারাও সমাজের, রাষ্ট্রের নানান কাজে ভূমিকা রাখছেন। এ ধারায় পুরুষরা যেভাবে এগিয়ে এসেছেন, তেমনি নারী শারিরীক প্রতিবন্ধীরাও আজ বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলছে।

যুগ যুগ ধরে নারীরা তাদের যোগ্যতা তুলে ধরে ইতিহাস তৈরি করেছেন। এমনকি শারীরিক অক্ষমতা অর্থ্যাৎ প্রতিবন্ধীতাকে জয় করেছেন এমন নারীরাও ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছেন। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাদেরকে দমিয়ে রাখতে পারেনি বরং নানান নিগ্রহ স্বত্ত্বেও তারা স্ব-স্ব ক্ষেত্রে অনন্য হয়েছেন। এমনই পাঁচ নারীকে নিয়ে আজকের আয়োজন। যারা মেধা ও মননে অন্যান্য নারীদের চেয়ে কম যায় না। তারা সকল নারীদের জন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন এবং প্রমাণ করে দিয়েছেন শারীরিক অক্ষমতাকে কীভাবে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে সমাজে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হয়। এমনই পাঁচ নারী হলেন- জিলিয়ান মারকাদো, স্টেলা ইয়াং, ক্লাউদিয়া গর্ডন, জুডি হিউম্যান এবং ডক্টর মায়া অ্যাঞ্জেলো। তারা আজ সকল নারীর জন্য উদাহরণ। এদের কেউ সাংবাদিক হিসেবে রেকর্ড গড়েছেন কেউবা সাহিত্যে পারদর্শিতা অর্জন করেছেন কেউ আবার সরকারি অফিসের বড় কর্মকর্তা এমনকি মডেল হিসেবেও বিশ্বজুড়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

Maya Angelou:

ড. মায়া অ্যাঞ্জেলোর নাম শুনেনি এমন মানুষ পাওয়া দুষ্কর। কিন্তু সম্ভবত আপনি এটা জানেন না, তিনি শারীরিক অক্ষমতার সঙ্গে বড় হয়েছেন। লেখক মায়া অ্যাঞ্জেলু, একজন স্বণামধন্য লেখিকা। ছোটবেলায় মায়া তার মায়ের প্রেমিক কর্তৃক যৌন নির্যাতনের শিকার হন। যখন সে তার সম্পর্কে অভিযোগ আনেন উল্টো তাকেই দোষী সাব্যস্ত করা হয়। ধর্ষণের শিকার হওয়া ছোট্ট মেয়েটি মনে মেনে মরতে থাকে। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন অ্যাঞ্জেলো। পাঁচটি বছর একবারে স্তব্ধ হয়ে যান তিনি। মুখ থেকে একটু সাড়া শব্দটি পর্যন্ত করার ক্ষমতা হারান তিনি। তিনি ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী কৃষ্ণাঙ্গ নারী যিনি তার আত্মজীবনীকে পাঠ্যে পরিণত করেন। এর পরের ইতিহাস তো সবার জানাই।

Stella Young:

স্টেলা ইয়াং সম্ভবত প্রথম নারী যিনি কি-না শারীরিক প্রতিবন্ধীতা হওয়া স্বত্ত্বেও মিডিয়াকে গ্রহণ করে নিজের ক্যারিয়ারের উন্নতি সাধন করেছেন। তিনি একাধারে একজন সাংবাদিক, একটি অনলাইন পত্রিকার সম্পাদক, কমেডিয়ান (তার নিজস্ব কমেডি শো ছিল) এবং অস্ট্রেলিয়ার প্রথম শারীরিক প্রতিবন্ধী নারী টিভি শো ‘নো লিমিটস’ এর পথ প্রদর্শক। ২০১৪ সালে টেডক্স টক নামক একটি টিভি প্রোগ্রাম করেছিলেন যার নাম I'm not your inspiration, thank you very much. তার টেডক্স কথোপকথনের মাধ্যমে, তিনি লাখ লাখ মানুষের চোখ খুলে দিয়েছিলেন এবং "অশ্লীলতার অনুপ্রেরণা" ধারণাটি প্রকাশ করেছিলেন। যারা শারীরিকভাবে অক্ষম ব্যক্তিদেরকে সমাজে হেয় প্রতিপন্ন করে তাদের চোখের কালো পর্দা সরিয়ে দেন স্টেলা। কীভাবে একজন প্রতিবন্ধী নারী সমাজে নিজ কার্যগুণে গুণান্বিত হতে পারে উক্ত অনুষ্ঠানে তারই গুণগান করেন তিনি।

Claudia L. Gordon:

আট বছর বয়সে বধির হওয়া জ্যামাইকার কন্যা ক্লাউদিয়া গর্ডন। বধিরতার জন্য জ্যামাইকাতে তার চলাফেরায় অসুবিধা হওয়ায় ১১ বছর বয়সে আমেরিকায় পাড়ি জমান তিনি। নিউ ইয়র্কের ‘লেক্সিন্টন স্কুল ফর দ্যা ডিফ’ স্কুলে পড়াশোনা করেন তিনি। সেই থেকে তার আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ক্লাউদিয়া কানে না শুনতে পেলেও তিনি মানুষের ঠোট পড়তে পারেন। ঠোট দেখেই ধরে নিতে পারেন মানুষটি কি বলছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট ওবামার সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি। প্রতিবন্ধীদের সমস্যা নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন তিনি। বধির ও শারীরিকভাবে অক্ষম ব্যক্তিদের নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন ক্লাউদিয়া। ন্যাশনাল কাউন্সিল অন ডিস্যাবিলিটি, দ্য ন্যাশনাল কোয়ালিশন ফর ডিসএবিলিবিলিটি রাইটস অ্যান্ড হোমল্যান্ড সিকিউরিটি এ কাজ করেছেন (যেখানে তিনি অক্ষম ব্যক্তিদের জন্য সরকারের জরুরি প্রস্তুতি পরিকল্পনা নিশ্চিত করার কাজ করেছেন)। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি হলো তিনিই যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ বধির নারী আইনজীবী এবং আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ের ল’ স্কুলের প্রথম স্নাতকসম্পন্নকারী ছাত্রী।

jillian mercado:

শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়ে জন্ম নেয়া জিলিয়ান মারকোডোর ছোট বেলা থেকে ফ্যাশন নিয়ে কাজ করার আগ্রহ দেখান। তার মা ছিলেন একজন ড্রেস মেকার, বাবা জুতা বিক্রেতা। সেখান থেকেই নিজের ফ্যাশনের প্রতি আগ্রহ রেখে নিউ ইয়র্ক ফ্যাশন ইন্সটিটিউট অব টেকনোলোজিতে ভর্তি হন। সেখান থেকে ফ্যাশনের সাথে কাজ করতে করতে জিলিয়ান মারকোডো শারীরিক প্রতিবন্ধী হিসেবে প্রথম মডেলিং শুরু করেন। তার আগে কেউ ভাবতেই পারেনাই একজন শারিরীক প্রতিবন্ধী হুইল চেয়ারে বসে মডেলিং করবে।  যখন তিনি মডেলিংয়ে কাজ করার সুযোগ পান তখন থেকেই তিনি অন্যান্য প্রতিবন্ধী সুন্দরীদের খুঁজতে থাকেন যারা কিনা হুইল চেয়ারে বসা স্বত্ত্বেও মডেলিংয়ে নিজেদের পেশা হিসেবে গ্রহণ করতে চান। প্রায় চার বছর পূর্বে, মারকাদো মডেলিংয়ে যুক্ত হন যা তার পুরো জীবনকে এমনকি সমগ্র মডেলিং ইন্ডাষ্ট্রিকে পাল্টে দিয়েছে। একটি ডিজেল জিন্স প্যান্টের বিজ্ঞাপন প্রচারাভিযানের জন্য তার ডাঁক পড়ে। পরের বছর মারকাদো আইএমজি  স্বাক্ষরিত মডেল হিসেবে আত্মনিয়োগ করেন। এরপর থেকে তাকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। সম্প্রতি তিনি বিয়ন্সের মার্চেন্ডাইজ ক্যাম্পেইনের হয়ে বিভিন্ন বিজ্ঞাপনে অভিনয় করেছেন।

Judith Heumann

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অগ্নি দূর্ঘটনায় আক্রান্ত হওয়ার জন্য জুডি হিউম্যানকে কর্মক্ষেত্র থেকে বাড়ি পাঠানো হয়েছিল, তখন তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে পৃথিবীতে কতটা বিভেদ রয়েছে মানুষের সঙ্গে মানুষের। সেসময়ই তিনি নিজের মনোবল শক্ত করে নিজের অক্ষমতাকে জয় করার সংকল্প করেন। নিউইয়র্ক সিটিতে তিনিই সর্বপ্রথম হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী নারী যিনি সেখানকার শিক্ষা বোর্ডে লাইসেন্স গ্রহণের জন্য আবেন করেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষ তার আবেদন নাকচ করে দেন। তবুও জুডি হাল ছাড়েন নি।  তিনি আদালতে বৈষম্যের অভিযোগে মামলা করে বসেন। তিনি জানতে পারেন, তাৎক্ষণিক কোনো বিপদে হয়তো তিনি ছাত্রদের সাহায্য করতে পারবেন না। কারণ তিনি হুইল চেয়ারে সীমাবদ্ধ। এমন সন্দেহের কারণে তাকে কেবল অস্বীকার করা হয়েছিল। তবে শিক্ষা বোর্ড তার আত্মবিশ্বাসে মুগ্ধ হয়ে তাকে শিক্ষিকা হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেন। তিন বছরের জন্য তিনি শিক্ষকতার সুযোগ পেলেন। পরবর্তীতে জুডি  যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী সেক্রেটারি হিসেবে শারীরিক প্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষ শিক্ষা ও পুনর্বাসনের কাজে নিযুক্ত হন। বর্তমানে তিনি আমেরিকার আন্তর্জাতিক বিভাগের বিশেষ উপদেষ্টা হিসাবে স্টেট ডিপার্টমেন্টের হয়ে কাজ করছেন।

লেখকঃ এস এম সজীব