ব্যাক্তিত্ব

হেনরি ফোর্ড; শূন্য থেকে সাফল্যের শিখরে উঠার প্রেরণা।

ব্যাক্তিত্ব শুক্রবার, ৩১ মে ২০১৯ ০৪:৫৬:২৮

মধ্যবিত্ত আমেরিকানদের সাধ্যের মধ্যে সখ মেটানোর জন্যে যে ব্যাক্তিটি অটোমোবাইল নিয়ে এসেছেন অত্যন্ত সুলভ মূল্যে তিনি হলেন হেনরি ফোর্ড। হেনরি ফোর্ড, যিনি ছিলেন বিশ্ব বিখ্যাত মোটর কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা। পৃথিবীর ইতিহাসে যে'কজন শিল্পপতি তাদের ব্যবস্থাপনা ক্ষমতা ও সাংগঠনিক দক্ষতায় অমর হয়ে আছেন, হেনরি ফোর্ডের অবস্থান সে তালিকায় বেশ উপরের দিকেই থাকবে। অটোমোবাইল আবিষ্কারের মাধ্যমে হেনরি ফোর্ড ও তার কোম্পানি বিখ্যাত হয়ে আছে, যেটি সত্যিকার অর্থেই মার্কিন শিল্প ও যাতায়ত ব্যবস্থায় বিপ্লব নিয়ে আসে।
এমনকি অ্যাডলফ হিটলার তার প্রজ্ঞা, জ্ঞান,ব্যবসায়ীক চিন্তাধারা বা বিজ্ঞানমনষ্ক ভাবনা দেখে একবার জনসম্মুখেই বলেছিলেন, হেনরি ফোর্ডই আমার অনুপ্রেরণা।  আজকে আমরা দেখবো  বিখ্যাত এ উদ্যোক্তা সম্পর্কে কিছু জানা-অজানা তথ্য ।


আমেরিকার অঙ্গরাজ্য মিশিগানের গ্রিনফিল্ড টাউনশিপের একটি খামার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন হেনরি ফোর্ড। তার জন্মতারিখ ১৮৬৩ সালের ৩০ জুলাই। মায়ের নাম মেরি ফোর্ড। বাবা ছিলেন একজন কৃষক। বাবার নাম উইলিয়াম ফোর্ড।

হেনরি ফোর্ড ছিলেন বিশ্ববিখ্যাত গাড়ির কোম্পানি ‘ফোর্ডে’র মালিক। অনেকে তাকে ভুল করে গাড়ির আবিষ্কারক মনে করেন। তিনি মূলত উদ্ভাবন করেছিলেন গাড়ি ব্যবসায়ের। তার হাত ধরেই মানুষের কাছে পৌঁছে গেছে চার চাকার এই যানটি। একটা সময় গাড়ি ছিল অনেক জটিল ও অনির্ভরযোগ্য একটি যান। ছিল অনেক দাম আর সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। হেনরি ফোর্ড তার মেধা দিয়ে দূর করেন গাড়ির ওইসব জটিলতা আর তা নিয়ে আসেন সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে। হেনরি ফোর্ডকে 'ম্যাস প্রোডাকশন' বা গণ উৎপাদনের উদ্ভাবক হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনি এই ধারণার প্রয়োগ করেন তার মোটর কোম্পানিতে, যা রাতারাতিভাবে যুক্তরাষ্ট্রে অটোমোবাইলের উৎপাদন খরচ ও ক্রয় মূল্য কমিয়ে দেয়।

ছোটবেলায় স্কুলে ভর্তি করা হলেও দুষ্টুমি করার কারণে স্কুল থেকে তাকে বহিষ্কার করা হয়। এরপর তিনি বাড়িতে মায়ের কাছে লেখাপড়া করেন। মায়ের মৃত্যুর কারণে সেটিও খুব বেশিদিন হয়নি। ছোটবেলাতেই মা-বাবা হারান হেনরি ফোর্ড। এরপরের জীবন কাটে এক প্রতিবেশীর কাছে। সম্পূর্ণ ভাবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে থেকেই তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন কিভাবে শূন্য থেকে উপরে উঠা যায়।

ছোটবেলায় হেনরি ফোর্ডের বাবা তাকে একটি পকেট ঘড়ি দেন। তার বয়স যখন ১৫ বছর তখন তিনি ঘড়িটি নিজে নিজেই বার বার নষ্ট করতেন এবং মেরামত করতেন। এটি ফোর্ডের এক ধরনের খেলা ছিল। ঘড়ির মেরামতি জানার কারণে তাদের এলাকার কারো ঘড়ি নষ্ট হলে ডাক পড়ত হেনরি ফোর্ডের। খুব সহজেই ফোর্ড ঘড়ির যে কোনো ধরনের যান্ত্রিক সমস্যা সমাধান করতে পারতেন হেসে খেলেই।


১৮৭৬ সালে মাকে হারিয়ে ভীষণভাবে ভেঙে পড়েন হেনরি ফোর্ড। পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায় অনেক আগেই। ১৮৭৯ সালে জীবিকার সন্ধানে ডেট্রয়েটে গিয়ে মেকানিকের কাজ নেন।


ডেট্রয়েটে পরিচয় হয় জেমস ফ্লেয়ারের সঙ্গে। তাকে নিয়ে আবার ফিরে আসেন নিজের পিতৃভূমিতে। সেখানে পৈতৃককাজ, খামারের কাজ শুরু করেন। জেমসকে সঙ্গে নিয়ে বাষ্প-ইঞ্জিনের কলাকৌশলও ভালোভাবে রপ্ত করেন। কিছুদিন পর অয়েস্টিং হাউস নামের এক বাষ্প-ইঞ্জিন কোম্পানি তাকে কাজের সুযোগ দেয়। কাজ করার পাশাপাশি তিনি গোল্ডস্মিথে ব্রায়ান্ট অ্যান্ড স্ট্যাটন বিজনেস কলেজে হিসাবরক্ষণ বিভাগে ভর্তি হন।


এসময় তিনি জানতে পারেন বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা যান্ত্রিক গাড়ি বা মোটর চালিত গাড়ি আবিষ্কারের জন্য গবেষণা করে যাচ্ছেন। যন্ত্রের প্রতি ছেলেবেলা থেকেই আগ্রহী ছিলেন ফোর্ড। তিনি সিদ্ধান্ত নেন অবসর সময়ে মোটর গাড়ি উদ্ভাবনের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাবেন। এ লক্ষ্যেই বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিসনের ‘এডিসন লাইটিং কোম্পানি’তে যোগ দেন। এখানে তিনি রাতের শিফটে কাজ করতেন। আর দিনের বেলা চলত গাড়ি নিয়ে গবেষণা। এভাবে প্রায় দুই বছর চলে তার এই প্রচেষ্টা। একসময় তিনি আয়ত্ত করে ফেলেন গাড়ি উদ্ভাবনের সব কলাকৌশল। তাই এবার পুরো সময়টাকেই এই গাড়ি উদ্ভাবনের পেছনে ব্যয় করার লক্ষ্যে চাকরি ছেড়ে দেন। চলতে থাকে তার গাড়ি নিয়ে গবেষণা।

১৮৯৩ সালের প্রথম দিকে সফলতার মুখ দেখেন হেনরি ফোর্ড। সে বছরের প্রথম দিকে নিজের উদ্ভাবিত গাড়ি নিয়ে রাস্তায় বের হন হেনরি ফোর্ড। প্রাথমিকভাবে সফলতা পাওয়ার পর এবার তার উদ্ভাবিত গাড়িটিকে আরও উন্নত করায় মনোযোগ দেন তিনি।

এভাবে একসময় ডেট্রয়েটের শহরতলিতে মাত্র ২৮ হাজার ডলার পুঁজি নিয়ে গড়ে তোলেন ফোর্ড মোটর কোম্পানি। ৬৬৫ একর জমির ওপর নির্মিত এ কারখানা থেকে হেনরি ফোর্ডের সময় প্রতি বছর মোটর গাড়ি ছাড়াও নির্মিত হতো দশ লাখ ট্রাক্টর। একশ’টি রেলপথ দিয়ে সেগুলো বিভিন্ন দেশে পাঠানো হয়।

ব্যক্তিগত জীবনেও হেনরি ফোর্ড খুব সৎ ছিলেন। মিথ্যার সঙ্গে কখনও আপোষ করেননি। অত্যন্ত কোমল হৃদয়ের অধিকারী ছিলেন। তিনিই প্রথম শ্রমিকদের দৈনিক ৫ ডলার মজুরি দেয়া শুরু করেন, যা আজকের দিনে ১১০ ডলারের সমতুল্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি আকুল হয়ে যুদ্ধ বন্ধের চেষ্টা করেন।

ফোর্ড মোটর কোম্পানির সব শ্রেণীর কর্মচারীর জন্য তিনি চালু করেন স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, কল্যাণ ফান্ড, বৃত্তি ও অন্যান্য সেবাধর্মী কর্মকাণ্ড। তার প্রতিষ্ঠিত ফোর্ড ফাউন্ডেশন আজও বিশ্বের উন্নতিতে অর্থ সাহায্য করে যাচ্ছে।

১৮৮৮ সালে তিনি ‘ক্লারা আলা ব্রায়ান্ট’ নামের এক তরুণীকে বিয়ে করে সংসার জীবন শুরু করেন।
এই মহান মানুষটি ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত হয়ে ১৯৪৭ সালের ৭ এপ্রিল মৃত্যুবরণ করেন।

এক জরিপে দেখা যায়, আমেরিকায় ফোর্ড পরিবার এখনও অনেক বেশি প্রভাবশালী। বর্তমানে প্রভাব ও অর্থ-সম্পদের ভিত্তিতে আমেরিকার প্রতাপশালী ২৩টি পরিবারের মধ্যে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ফোর্ড পরিবার।

হেনরি ফোর্ডের সবচেয়ে জনপ্রিয় কিছু উক্তিটি হলো,
* দোষ খুঁজো না, সমাধান খোঁজ করো।
* ব্যস্ততা হল পুনরায় বেশি বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে শুরু করার সুযোগ।
* সবকিছুর আগে প্রস্তুত হওয়াটাই সাফল্যের গোপন কথা।
* ব্যায়াম এমনই জিনিস- যদি তুমি স্বাস্থ্যবান হও তাহলে এর প্রয়োজন নেই। আর যদি অসুস্থ থাকো তাহলে এটা করতে পারবে না।
* সমাধান করার চেয়ে বেশিরভাগ মানুষ সমস্যা নিয়ে সময় আর শক্তি ব্যয় করে।
* শিল্পপতিদের জন্য ভালো একটি নিয়ম হচ্ছে, সর্বোচ্চ মজুরি দিয়ে সবচেয়ে কম খরচে ভালো জিনিস তৈরি করা।
* পৃথিবীর জন্য কিছু করলে পৃথিবীও তোমার জন্য করবে। আর সেটাই তোমার সাফল্য।

লেখকঃ এস এম সজীব