ব্যাক্তিত্ব

স্বাধীনতাকামী নেতা তিতুমীর

ব্যাক্তিত্ব রবিবার, ০৫ মে ২০১৯ ০৩:১০:১৯

ভারতবর্ষের ইতিহাসে যে কজন ব্যক্তি ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত তাদের মধ্যে মীর নিসার আলী তিতুমীর এক জ্বলন্ত উদাহরণ। শোষণের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে নিজের জীবন বিলিয়ে দিতেও তিনি পিছ পা হন নি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার,ন্যায়ের পথে অবিচল এমন এক মহান নায়ক সম্পর্কে আজ আমরা জানার চেষ্টা করব।

মীর হাসান আলী ও আবেদা রোকাইয়া খাতুনের পুত্র মীর নিসার আলী তিতুমীর,১৭৮২ খ্রিষ্টাব্দে, চব্বিশ পরগণা জেলার  বারাসাত মহকুমার বসিরহাট থানার অন্তর্গত চাঁদপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। গ্রামের মক্তব থেকে শিক্ষা শুরু করে অল্প বয়সের মধ্যে আরবী ফারসী উর্দু তার দখলে চলে যায়। একজন কুস্তিগির হিসেবে তার ছিল অনেক সুনাম। নদীয়ার জমিদারের অধীনে লাঠিয়াল বাহিনীতে চাকুরী গ্রহন করে তিনি তার কৃতিত্বের পরিচয় দেন। হজ্জ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কা আগমন করলে তার সাথে দেখা হয় যুগশ্রেষ্ঠ সংস্কারক মাওলানা সৈয়দ আহমদ বেরলভীর। তার গুনে মুগ্ধ হয়ে মুরীদ হন মীর নিসার আলী।
দেশে ফিয়ে গিয়ে নিজেকে নিয়োজিত করেন ধর্ম ও সমাজ সংস্করণে। ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রাম পরিচালনা করে নিজেকে মুসলিম জাগরণের অগ্রসৈনিক  পরিচয় দিতে একটুও দেরি করেন নি। নারিকেলবাড়িয়ার নিকটবর্তী হায়দারপুরে খানকা স্থাপন করে, "তরিকা-ই-মোহাম্মদী" নামে সুন্নী মতবাদ প্রচার করেন।
ডব্লিউ হান্টার বলেন,'কলকাতার উত্তর ও পূর্ব জেলাগুলোতে গিয়ে তিনি বহু লোককে নিজের মতবাদে দীক্ষিত করেন এবং বিধর্মীদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য গোপনে প্রস্তুতি গ্রহণ করেন।'

তিতুমীরের শিক্ষা ছিল মুসলিম সমাজ থেকে পীর মানা,কবর উপর মাযাব তৈরি করা ইত্যাদি থেকে মুসলিম সমাজকে রক্ষা করা।

শোষিত ও উৎপীড়িত সম্প্রদায়ের বন্ধু:

নিজেকে কৃষকদের পরিচয় দানকারী সমাজ সংস্কারক তিতুমীর,নিজেকে নিয়োজিত করেন অত্যাচারী জমিদার ও নীলকরদের শোষণের বিরুদ্ধে। কোনো চাষী নীল চাষে অস্বীকৃতি হলে তার উপর নীল করেরা অবর্ণনীয় অত্যাচার করত। কৃষকদের অপারগতা তার জন্য ছিল কালস্বরূপ।
অশ্লীল গালাগালি থেকে শুরু করে কিল, ঘুষি, প্রহার, পুরুষদের ধরে নীল কুটিতে অন্ধকার কক্ষে মাসের পর মাস আটক করে রেখে বেত্রাঘাত করা ছিল মামুলি ব্যাপার। খাদ্য স্তুপে অগ্নিসংযোগ ঘর বাড়ি অগ্নিদগ্ধ করে নীল সাহেবরা সাধারণ চাষীদের মৃতপ্রায় করে ফেলত।
ঠিক তখনি আবির্ভূত হন তিতুমীর। সমাজ সচেতনতার পাশাপাশি সামাজিক কলাকৌশল সম্পর্কেও শিক্ষা দান করেন। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কৃষক সমাজ তিতুমীরের নেতৃত্বে শোষন নির্যাতনের বিরুদ্ধে অপ্রতিরোধ্য প্রতিবাদী শক্তিতে পরিণত হয়।

দাড়িকর প্রতিহতকরণ

জমিদাররা দাড়ির উপর কর ধার্য করা শুরু করল।শুধু তাই কি? রায়তদের দাড়ি কমিয়ে দিতে তারা দ্বিধাবোধ করত না। তিতুমীর অনুসারীরা সুন্দরভাবে দাড়ি রাখায় তাদের সহজেই অন্যদের থেকে পৃথক করা যেত, যার ফলে জমিদারদের অত্যাচারে তাহারা সর্বদা থাকত অতিষ্ঠ।
গুনিয়ার জমিদার রামনারায়ন ও পুড়ার জমিদার কৃষ্ণদে রায় দাড়িকর নিয়ে খুব বেশিই বাড়াবাড়ি শুরু করেন। তিতুমীর ও তার সমর্থকেরা দাড়িকর দিতে অস্বীকৃতি জানালে জমিদারেরা লাঠিয়াল বাহিনী প্রেরণ করে তিতুমীরের বিরুদ্ধে।থানায় নালিশ,বারাসাত ম্যাজিস্ট্রেটের কোর্টে মামলা দায়েরে ও কলিকাতা কমিশনারের কাছ থেকে প্রতিকার চেয়ে ব্যর্থতা তাহাকে বুঝাতে সক্ষম করে যে,ইংরেজী শোষক গোষ্ঠী জমিদারের স্বার্থেই নিয়োজিত। ১৮৩০ সালে ৩০০ অনুচরসহ পুড়া গ্রাম আক্রমন,সেখানকার বাজার লুট করে সবার জন্য ভয়ানক মানব হিসেবে নিজেকে পরিচয় দেন তিনি।

বারাসাত বিদ্রোহ:

পরাজয়ের গ্লানি মোচন ও তিতুমীর বাহিনীকে ধ্বংস করার লক্ষ্যে তারা ব্রিটিশ সরকারকে তিতুমীরের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের প্ররোচিত করে। এ প্রক্রিয়ায় তারা প্রথমে তিতুমীরকে ব্রিটিশ সরকারের কাছে দেশদ্রোহী হিসেবে আখ্যায়িত করে। কিন্তু তিতুমীরের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে,তার সংগ্রাম ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে নয়, তিনি জমিদার ও নীলকরদের অত্যাচার থেকে দরিদ্র কৃষকদের রক্ষা করেছেন মাত্র। কিন্তু ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ তিতুমীরের কথায় কর্ণপাত করে নি বরং তাকে শায়েস্তা করার জন্য হুমকি প্রদান করে। এ পরিস্থিতিতে আত্মরক্ষার্থে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন।
তার সংগ্রাম ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে নয়,সে কথা বুঝাতে বুঝাতে ব্যর্থ হয়ে, ব্রিটিশ সরকারের হঠকারিতামূলক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তিতুমীর প্রতিরোধ গড়ে তুলেন।বিপ্লবী চেতনায় উজ্জীবিত তিতুমীর শক্তিসঞ্চয় করে অতঃপর ১৮২৫ সালে পরগণা,নদীয়া,ফরিদপুর সংযুক্ত করে একটি স্বাধীন এলাকা গঠন করে প্রত্যক্ষভাবে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন যা ইতিহাসে বারাসাত বিদ্রোহ নামে পরিচিত।


ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বিরুদ্ধে এটি প্রথম বিদ্রোহ।

এরূপ বিদ্রোহের সংবাদ বারাসতের ম্যাজিস্ট্রেট আলেকজান্ডার কাছে আসলে বিরাট এক পুলিশ বাহিনী নিয়ে তিতুমীর বিরুদ্ধে সংঘর্ষে অবতীর্ণ হন কিন্তু তিতুমীর সুযোগ্য নেতৃত্ব ও গোলাম মাসুদ খানের সেনাপতিত্বে গণবাহিনী ইংরেজ বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে।

ব্যাপক রণপ্রস্তুতির প্রয়োজনীয়তা,নিজ বাহিনীর নিরাপত্তা,অস্ত্রশস্ত্র মজুদের জন্য নারিকেল বাড়িয়ায় তৈরি করেন এক বিপ্লবী কেন্দ্র যার চতুর্দিকে বাঁশের কেল্লা। বাঁশ ও কাদা দিয়ে দ্বিস্তর বিশিষ্ঠ এই অপূর্ব কেল্লা নির্মাণ করেন তিনি।যার ভিতরে রয়েছে অনেক প্রকোষ্ঠ। তার দৃঢ় ধারনা ছিল,এটা বাঁশের তৈরি হলেও প্রস্তর নির্মিত দূর্গ অপেক্ষা দুর্জয় ও দুর্ভেদ্য।
স্বাধীনতাকামী অনেক লোক এখানে বাঁধ ভাঙা জোয়ারের ন্যায় সমবেত হয়। সাথে সাথে গ্রহণ করে সামরিক প্রশিক্ষণ।
তৎকালীন ভারতের বড় লর্ড উইলিয়াম বেন্টিন্ক তিতুমীর দমনের জন্য লেফটেন্যান্ট কর্ণেল স্টুয়ার্ড নেতৃত্বে একদল সুসজ্জিত বাহিনী প্রেরণ করে।
কেল্লা তাক করে শুরু হয় গুলিবর্ষন।বন্দুকের মুহুর্মুহু গুলিতে অস্থির করে ফেলে কেল্লার বাসিন্দাদের।কামান তাক করে রাখা হয় কেল্লার দিকে।
পাল্টা আক্রমনে ইংরেজ বাহিনী পিছু হাটতে বাধ্য হয়। তিতুমীর অসম যুদ্ধ পরিচালনা করেন ধীরস্থিরভাবে। আত্মসমর্পম না করায় এই অসম যুদ্ধে কামান ব্যবহার শুরু করে ইংরেজরা। ভেঙে পড়তে শুরু করে তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা।একটি কামানের গোলার আঘাত করে তিতুমীরের ডান ঊরুতে।ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় তার পা। আত্মসমর্পণ চেয়ে সম্মুখ যুদ্ধে প্রাণ বিসর্জন শ্রেয় বিবেচনা করে বিপ্লবী বীর তিতুমীর শাহাদাত বরণ করেন। সেনাপতি মাসুমকে মৃত্যুদন্ড প্রদান করা হয়।স্বাধীনতাকামী দেশপ্রেমিক অনেককেই কারাদণ্ডে দন্ডিত করা হয়।

তিতুমীরের হাজারো চেষ্টা সফলতা আনতে সক্ষম হয়নি,কিন্তু জাতীয় সংগ্রামে তিনি প্রেরণা হিসেবে কাজ করেন যাতে কোনো সন্দেহ নেই। তিতুমীরের মহান আত্মত্যাগ যুগ যুগ ধরে শোষিত বঞ্চিত অধিকারহারা মানুষের সংগ্রামে পথ দেখাবে। তাহার আদর্শ জাতির জন্য হয়ে থাকবে অনুকরণীয়।

    
লেখকঃ উবায়দুর রহমান রাজু

ট্যাগ : তিতুমীর,