ব্যাক্তিত্ব

মাদার তেরেসাঃ মানবতার সেবায় যিনি অমর হয়ে আছেন।

ব্যাক্তিত্ব বৃহস্পতিবার, ২৫ এপ্রিল ২০১৯ ০২:৩৫:৪২

“আমার শরীরজুড়ে প্রবাহিত আলবেনিয়ার রক্ত,নাগরিকত্বে একজন ভারতীয়, আর ধর্মের পরিচয়ে আমি একজন ক্যাথলিক নান।তবে নিজের অন্তর্নিহিত অনুভূতি দিয়ে আমি আবগাহন করি বিশ্বময় এবং মনে প্রাণে অবস্থান করি যিশুর হৃদয়ে” -মাদার তেরেসা

নীল পাড় আর সাদা শাড়ি। এই কথাটি শুনলেই যার নাম চোখের সামনে ভেসে আসে তিনি মাদার তেরেসা। এই পৃথিবীতে যারা ছিলো অনাকাঙ্ক্ষিত,  যাদের ভাগ্য সহায় ছিলোনা, যারা ছিলো পরিবার থেকে বিতাড়িত, যারা ছিলো অসহায়, বিপন্ন, এই সমাজ যাদের গ্রহন করেনি কোনকালে, যারা ছিলো স্নেহ বঞ্চিত, ভাগ্য ও জীবন যাদের অভিশাপ দিয়েছিলো সব সময় সেই সব মানুষের জীবনে আশার আলো নিয়ে এসেছিলেন মাদার তেরেসা। অসুস্থ, বিপন্ন, হতদরিদ্র মানুষের বেচে থাকার কারণ হয়ে উঠেছিলেন মাদার তেরেসা। এমনকি সমাজ ও পরিবার থেকে বিতাড়িত কুষ্ঠরোগীদের তিনি শুধু আশ্রয় দেননি, প্রাণের মায়াকে তুচ্ছ করে নিজ হাতে তাদের সেবা করেছেন, আগলে রেখেছিলেন পরম মমতায়, ঢেলে দিয়েছিলেন অঢেল স্নেহ ভালোবাসা। তিনিই তেরেসা। তিনিই, মাদার তেরেসা।

 যার সম্পূর্ণ জীবনই ছিলো ত্যাগের, মহিমার।  তিনি তার সারাটা জীবন ব্যয় করেছেন মানবতার কল্যানে। মানুষের সেবায় অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছেন নিজের জীবনকে। মহীয়সী নারী মাদার তেরেসা আর্তমানবতার সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করে সারাবিশ্ববাসীর মনে  অমর হয়ে রয়েছেন।

তেরেসার জন্মঃ মাদার তেরেসা (আলবেনীয়; Nene tereza,ন্যন্য টেরেযা) আজকের মেসিডোনিয়ার স্কোপি শহরে ১৯১০সালের ২৬ আগষ্ট একটি ক্যাথলিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ডাক নাম গোস্কসা। গোস্কসা একটি তুর্কি শব্দ।যার অর্থ কুসুমকলি। পুরো নাম এগনেস গঞ্জে বয়াজিউ। বাবার নাম ছিলো নিকোলো ও মা দ্রানা বয়াজুর। তাদের আদি নিবাস আলবেনিয়ার একটি গ্রামে। ৫বছর বয়সেই তিনি ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহন করেন। ছোট বেলা থেকেই তিনি ধর্মীয় রীতিনীতি গুলো শিখে ফেলেন। তার বাবা ছিলেন একজন রাজনীতিবিদ। তেরেসার বয়স যখন আট তখন তার বাবা মারা যায়। চরম অর্থিক দুর্দশার মধ্যে দিয়ে যেতে হয় তার পরিবারকে। কিন্তু এতো কঠিন পরিস্থিতিতেও তেরেসার মা তাকে ও তার  বোনদেরকে বড় করে তুলেন সুন্দর নিয়ম নিষ্ঠা ও ধর্মীর অনুশাসনের মধ্যেই। ছোট্ট তেরেসা মিশনারিদের জীবন ও কাজ কর্মের গল্প শুনতে অনেক ভালোবাসতেন।

কর্মজীবনঃ মাত্র ১৮ বছর বয়সে সন্যাসব্রত গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেন তেরেসা। ১৯২৮ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর গৃহত্যাগ করে ‘সিস্টার্স অব লোরেটো’ সংস্থায় যোগ দেন সিস্টার হিসেবে। মা আর দিদিদের সঙ্গে মাদার তেরেসার আর কোনোদিন দেখা হয়নি। তৎকালীন সময়ে ভারতে বাংলায় ধর্মীয় কাজ করতেন যুগোস্লাভিয়া ধর্মযাজকরা। তাদের সিদ্ধান্ত ছিলো, লোরেটো সিস্টারদের মধ্যে যারা আইরিশ সম্প্রদায়ভুক্ত তারা যাবেন ভারতবর্ষের মতো এলাকায় কাজ করতে। মাদার তেরেসা তাই তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কাজ শুরু করতে চাইলেন। ব্রিটিশ শাসিত ভারতের দার্জিলিংয়ে ১৯২৮ সালে সন্ন্যাসিনী হওয়ার প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন তিনি।

তেরেসার ভারত গমনঃ ১৯২৯ সালের ৬ জানুয়ারি কলকাতা পৌঁছলেন তেরেসা। ১৯৩১ সালের ২৪ মে সর্বপ্রথম দারিদ্র্য, বার্ধক্য ও সংযমের সাময়িক সংকল্প গ্রহণ করেন তিনি। লরেটো কনভেন্ট স্কুলে শুরু হলো তার শিক্ষিকা জীবন। পাশাপাশি তিনি একটি হাসপাতালেও কাজ করতেন। সেখানেই সর্বপ্রথম দুঃখ ও দারিদ্র্যের সঙ্গে তাকে সংগ্রাম করতে হয়, যা ছিল তার কল্পনারও বাইরে। মানবসেবাকে জীবনের লক্ষ্য হিসেবে নিয়ে ঘর ও সংসার জীবনের আনন্দ ত্যাগ করে এসে তিনি যোগ দেন আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে মিশনারী মেয়েদের দল ‘সিস্টার্স অব লোরেটোতে এবং সেখানেই তিনি সাধু সেইন্ট তেরেসার নামানুসারে ‘সিস্টার ম্যারি তেরেসা’ নাম গ্রহণ করেন। সেখান থেকে তিনি দার্জিলিংয়ে পাড়ি জমান এবং ধর্মপ্রচারের কাজ শুরু করেন। পূর্ব কলকাতায় বহু বছর তিনি মিশনারি মেয়েদের স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা পদে নিযুক্ত ছিলেন। খুব কম সময়ের মধ্যেই তিনি খুব ভালো বাংলা ও হিন্দী শিখে নেন। স্কুলে তিনি ইতিহাস ও ভূগোল শেখানোর পাশাপাশি কীভাবে শিক্ষা দ্বারা এই অঞ্চলের মেয়েদের দারিদ্রতা দূর করা যায়, সেদিকেও মনোনিবেশ করেন। সিস্টার তেরেসা ধর্মের পথে পবিত্রতার ও সেবার শপথ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম নেন ১৯৩১ সালের মে মাসে। এরপর শিক্ষকতার অনেকগুলো বছর পার করে ২৪শে মে, ১৯৩৭ সালে তিনি তাঁর চুড়ান্ত শপথ গ্রহণ করেন।

৩৬ বছর বয়সে তিনি নিজের হৃদয়ে ভারতের গরীব অসহায় মানুষদের জন্য কিছু করার তাড়না অনুভব করেন।  নিজের প্রচেষ্টায় বিভিন্ন জায়গা থেকে মৌলিক চিকিৎসার প্রশিক্ষণ নেন, আর তারপর বেরিয়ে পড়েন ভারতের রাস্তায় দরিদ্রের মধ্যে, যারা হতদরিদ্র, অভাগাদের মধ্যেও যারা সবচেয়ে অসহায়, সেই আশাহীন, সহায়-সম্বলহীন মানুষদের জন্য। খুবই সামান্য সম্বল নিয়ে বের হয়ে ভারতভাগের পর ১৯৪৮ সালের ভারতে এটা একটা দূর্দান্ত কঠিন কাজ ছিলো। এমন প্রায়ই হতো যে হতদরিদ্রের মুখে খাবার তুলতে গিয়ে তিনি নিজেই অনাহারে থেকেছেন অনেকদিন, এমনকি মানুষের খাবারের জন্য তাকে হাত পাততে হতো অন্যদের কাছে। তাঁর সমগ্র জীবনই যেন দেখিয়ে গেছে কিভাবে অন্যদের দূঃখের ভার নিজের কাঁধে তুলে নিতে হয়। সে বছরের ১৭ই আগস্ট তিনি নীল পাড়ের সাদা শাড়ি তুলে নেন নিজের পরবর্তী সারা জীবনের জন্য। ধীরে ধীরে তাঁর এই শাড়িই হয়ে ওঠে বস্তি থেকে রাস্তা পর্যন্ত কলকাতার সকল অবহেলিত, অনাকাঙ্ক্ষিত, স্নেহহীন মানুষদের জন্য আশা ও মমতার প্রতীক। নিজের প্রার্থনার খাতায় তিনি লিখে যান- “হে ঈশ্বর, আমাকে শক্তি দিন এই মানুষগুলোর জীবনের আলো হয়ে ওঠার, যেন আমি তাদেরকে অন্তত আপনার দিকে ফেরাতে পারি।”

 তেরেসার জনহিতৈষী কর্মকাণ্ডঃ মাত্র ১২ জন সদস্য নিয়ে ১৯৫০ সালের ৭ অক্টোবর প্রতিষ্ঠা করেন  ‘দ্য মিশনারিজ অফ চ্যারিটি’ । যার শাখা বর্তমানে পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে আছে। ১৯৫২ সালে এই চ্যারিটির অধীনেই গড়ে উঠে ‘নির্মল হৃদয়’ কুষ্ঠ রোগীদের জন্য ‘শান্তি নগর’। ১৯৫৫ সালে মাদার তেরেসা স্থাপন করেন ‘নির্মল শিশুভবন’। ১৯৬৩ সালে গড়ে তোলা হয় ‘মিশনারিজ অব চ্যারিটি’ -এর ব্রাদার শাখা। মাত্র ১২ জন সদস্য নিয়ে যে চ্যারিটির যাত্রা শুরু হয়েছিল সময়ের ব্যবধানে তা কয়েক হাজারে পৌঁছায়। তারা সবাই বিভিন্ন দেশের প্রায় ৪৫০টি সেবাকেন্দ্রে মানবসেবার কাজ করে যাচ্ছে।

 ভারতের পাশাপাশি বিশ্বের অন্যান্য দেশের দু:স্থ মানুষদের সেবা করার জন্য ভারতের বাইরে প্রথমবারের মতো ১৯৬৫ সালে ভেনিজুয়েলায় মিশনারি অব চ্যারিটির শাখা প্রতিষ্ঠা করা হয়। এরপর ক্রমান্বয়ে বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৬৮ সালে রোম, তানজানিয়া এবং অস্ট্রিয়াতে শাখা খোলা হয়। ১৯৭০-এর দশকে এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ ও আমেরিকার কয়েক ডজন দেশে শাখা প্রতিষ্ঠিত হয়।

 মানবতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মাদার তেরেসা ঘুরে বেড়িয়েছেন পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত। সব বাধা পেরিয়ে গড়ে তোলেন মানবতার বিরল দৃষ্টান্ত। সবচেয়ে যারা গরিব, সবচেয়ে করুণ যাদের জীবন- তাদের সেবা করাই ছিল মাদার তেরেসার ব্রত। ১৯৪৮ সালের ২১ ডিসেম্বর তিনি ভারতের নাগরিকত্ব লাভ করেন। আমৃত্যু তিনি অসহায় মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন। ১৯৯৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর কলকাতার মাদার হাউসে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই মহাত্মা নারী।

তেরেসার যত অর্জনঃ মাদার তেরেসা প্রথম পুরস্কার পান ১৯৬২ সালে। ভারত সরকার তাকে ভারতের সর্বোচ্চ সম্মানিত ‘পদ্মশ্রী’ উপাধিতে ভূষিত করে। পরে দুস্থ মানবতার সেবায় আত্মোৎসর্গের স্বীকৃতিস্বরূপ মাদার তেরেসা ১৯৭৯ সালে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পুরস্কার নোবেলর শান্তিতে পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া ১৯৭১ সালে পোপ জন শান্তি পুরস্কার, ১৯৭২ সালে জওহরলাল নেহরু, ১৯৮০ সালে ভারতরত্ন, ১৯৮৫ সালে প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম, ১৯৯৪ সালে কংগ্রেশনাল গোল্ড মেডেল সহ বিভিন্ন দেশের অসংখ্য পুরস্কার ও সাম্মানিত উপাধিতে ভূষিত হন। কলকাতার স্বর্গীয় টেরিজা হিসেবে অভিহিত করা হয়ে থাকে মাদার তেরেসাকে।

 জাতিসংঘ মাদার তেরেসার গড়া মিশনারি অব চ্যারিটি সংগঠনটিকে সম্মাননা জানাতে প্রচলন করেছিল ‘সেরেস মেডেল’। এ মেডেলের এক পিঠে ছিল ভিক্ষাপাত্র হাতে অপুষ্টিতে ভোগা একটি শিশুর মূর্তি আর অন্য পিঠে মাদার তেরেসার ছবি।

 মাদার তেরেসার সবচেয়ে বড় অর্জন বলা যায়, তার দেখিয়ে দেওয়া আদর্শকে। আজো তার আদর্শের মৃত্যু হয়নি। তার আদর্শ নিয়ে বর্তমানে বিশ্বব্যাপী ‘মিশনারিজ অব চ্যারিটি’ এর লাখো সিস্টার মানবসেবায় নিয়োজিত আছেন।

সম্মান,খ্যাতি কোনো কিছুই তাকে পথভ্রষ্ট করতে পারেনি। নিজের শেষদিন পর্যন্ত অন্যের কল্যাণে ব্যয় করেছেন নিজেকে। নিজের ব্যক্তিজীবনেও তেরেসা ছিলেন অত্যন্ত সাদামাটা।সারাজীবন কাটিয়েছেন মাত্র ৩টি শাড়ি দিয়ে। দুটো শাড়ি নিয়মিত পরার আর একটা শাড়ি আলমারিতে তোলা থাকতো। সেই ৩টি শাড়িতেও ছিলোনা কোনো চাকচিক্য। নীল পাড়ের ৩টি সাদা শাড়িতেই কাটিয়েছেন বিশাল কর্মময় জীবন। কিন্তু তার মন ছিলো আকাশের মতো বিশাল। সেই বিশাল আকাশের নিচে ঠাই পেয়েছিলো লক্ষ কোটি অসহায় দরিদ্র মানুষ।

মাদার তেরেসা একবার বলেছিলেন,-  “আমাদের মাঝে সবাই বড় কাজ গুলো করতে পারবে তা না, আমরা অনেক ছোট কাজ গুলো করতে পারি অনেক ভালোবাসা দিয়ে”।ছোট ছোট কাজ গুলো ভালোবাসা দিয়ে করে গিয়েছেন বলেই একদিন সব বড় বড় কাজের পাহাড় জমে গেছে। আমাদের ও জীবনের লক্ষ এমনই হওয়া উচিৎ।

লেখকঃ এস এম সজীব