ব্যাক্তিত্ব

রাজিয়া সুলতানাঃ দিল্লির অকুতোভয় এক নারী সুলতানের গল্প

ব্যাক্তিত্ব রবিবার, ১৪ এপ্রিল ২০১৯ ০৫:২৭:১৩

১২১১ সালে দিল্লি সালতানাতের সুলতান হিসেবে অভিষেক হয় শামসুদ্দিন ইলতুৎমিশের। আর এর সাথে ভারতে দাসদের শাসনকাজে নেতৃত্বে দেয়ার মত ঘটনা ঘটল। ১২১১ থেকে ১২৩৬ সাল পর্যন্ত বেশ প্রশংসনীয় দিল্লি সুলতান হিসেবে ইলতুৎমিশ ভূমিকা পালন করেন। দিল্লি সালতানাতে তখন ৪০ জন তুর্কিদের নিয়ে এক প্রভাবশালী অভিজাত কাউন্সিলের অস্তিত্ব ছিল। এদেরকে বলা হত চিহালগানী বা চল্লিশ চক্র। শাসনকার্যে এরা কলকাঠি নাড়ত। যার ফলে যিনি সুলতান তাকে চিহালগানীর মন রক্ষা করে চলতে হত। নিজের জীবনের শেষদিকে এসে সুলতান ইলতুৎমিশ এক সমস্যায় পড়লেন। নিজের যোগ্যতম পুত্র অকালেই মারা গেলে উত্তরাধিকার প্রশ্নে ইলতুৎমিশ চিন্তিত হয়ে পড়লেন। এদিকে তার কন্যা রাজিয়া সুলতানা ছিলেন রাজনৈতিক এবং সামরিক দিক থেকে বেশ সচেতন এবং দক্ষ। ইলতুৎমিশ কিঞ্চিত অস্বস্তি বোধ করলেও শেষ পর্যন্ত দিল্লির মসনদে প্রথমবারের মত এক নারী শাসকের উত্থান হয়। ভারতের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ এ চরিত্রের চার বছরের শাসন বেশ ঝড় ঝাপ্টার মধ্য দিয়েই অতিক্রম হয়।

১২০৫ সালে জন্ম নেয়া রাজিয়া সুলতানা তার বাল্যকাল থেকেই পিতা ইলতুৎমিশ এর কাছ থেকে রাজনীতি এবং সমরবিদ্যার পাঠ গ্রহণ করেন। ইলতুৎমিশও রাজিয়ার রাজনীতির প্রতি আগ্রহ দেখে নিজে শিক্ষা দিতে থাকেন। এসময় সুলতান নিজ হাতে রাজিয়াকে অস্ত্র চালনার শিক্ষা দেন। যথারীতি ইলতুৎমিশ এর মৃত্যুর পর রাজিয়া সুলতানা যখন একজন নারী হয়ে সালতানাতের সর্বোচ্চ পদে মনোনয়ন পান তখন সাম্রাজ্যের একটা অংশ বিশেষ করে আলেম উলামা শ্রেণী এবং চিহালগানী এর বিরোধিতা করে রাজিয়ার সিংহাসন আরোহন ঠেকানোর চেষ্টা করে। আর এ কাজে তারা সফলও হয়। চিহালগানী ইলতুৎমিশ এর ছোট ছেলে রুকনুদ্দীন ফিরোজকে দিল্লির মসনদে বসায়। কিন্তু রুকনুদ্দীনের কর্মকাণ্ডে বিরক্ত হয়ে চিহিলগানী তাকে হত্যা করে বসে। রুকুনুদ্দিন ফিরোজের হত্যার পর আপাতত সুলতান পদ শূন্য হয়ে পড়ে। আর এদিকে সুযোগের অপেক্ষায় থাকা রাজিয়া সুলতানা দিল্লির জনগণের সহায়তা নিয়ে ১২৩৬ সালে সুলতানের পদ  অলংকৃত করেন। আপাতত যোগ্য কেউ না থাকায় চিহিলগানী ও সাম্রাজ্যের আলেম উলামারা রাজিয়া সুলতানাকে আর বাধা দেয়নি। সিংহাসনে বসেই রাজিয়া নিজের নারীসুলভ দুর্বলতাকে থোড়াই কেয়ার করে পুরুষের বেশভূষায় রাজ্য চালাতে থাকেন। নিজের নাম সুলতানা থেকে সুলতান'এ রূপান্তর করেন। প্রাসাদে নিজের অনুগত একটা দল বানাতে গিয়ে তিনি তুর্কিদের রোষানলে পড়েন। এছাড়া সে সময়ের পরম প্রতাপশালী চিহিলগানের সাথেও রাজিয়ার বিরোধ স্পষ্ট হয়ে পড়ে। সাথে করে অসহনশীল আলেম উলামারা রাজিয়ার জন্য মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। রাজিয়া সুলতানা তার ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে আবিসিনিয়ার দাস ইয়াকুতকে নিয়োগ দিলে ঝামেলা বাঁধে। তিনি তাকে প্রধান আস্তাবল হিসেবেও নিয়োগ দেন। ইয়াকুতের প্রতি এমন দুর্বলতাকে তার শত্রুরা নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করে।  তারা সংবাদ রটায় যে ইয়াকুতের সাথে রাজিয়ার অবৈধ সম্পর্ক আছে। এমন অবস্থায় বিদ্রোহও দেখা দেয় রাজ্যজুড়ে। লাহোরের বিদ্রোহ রাজিয়া দমাতে পারলেও বাথিন্দার গভর্ণর ইখতিয়ারউদ্দিন আলতুনিয়া এবং অন্যান্য অঞ্চলের বিদ্রোহীদের কাছে হার মানতে হয় তাকে। দিল্লির কেন্দ্রীয় কাজী রাজিয়া সুলতানাকে ক্ষমতা থেকে অপসারণের রায় দেন। চিহিলগানী এবার ইখতিয়ারউদ্দিন আলতুনিয়াকে দিল্লির ক্ষমতায় বসায়। খুব শীঘ্রই রাজিয়া আলতুনিয়ার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। অনুগত কিছু সৈন্য নিয়ে রাজিয়া এবার আলতুনিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হোন। যুদ্ধে পরাজিত হয়ে রাজিয়া আলতুনিয়াকে বিয়ে করেন। তবে তার এই বিয়ে ছিল রাজনৈতিক। তিনি মনেপ্রাণে চেয়েছিলেন হারানো মসনদ যেন আবার তার বাহুডোরে ফিরে আসে আর এজন্য তিনি আলতুনিয়াকে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। ইতিমধ্যে আলতুনিয়াকেও ক্ষমতা থেকে অপসারণ করে চিহিলগানী৷ নতুন সুলতান হিসেবে এবার অভিষেক হয় রাজিয়ার ভাই মুইজুদ্দিন বাহরাম শাহ। রাজিয়া খুব শীঘ্রই স্বামী আলতুনিয়াকে নিয়ে দিল্লি আক্রমণ করে বসেন।  এ যুদ্ধে রাজিয়ার অনুগত কিছু আমির আলতুনিয়া-রাজিয়ার পক্ষে যোগদান করে। যদিও তারা বাঁক বদল করে আবার দিল্লি ফিরে যায়। দিল্লি বাহিনীর সাথে আলতুনিয়া-রাজিয়া শক্তি আর দাঁড়াতেই পারেনি। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আলতুনিয়াকে রেখে রাজিয়া উত্তর ভারতে পালিয়ে যান। অনেকবার শক্তি সঞ্চয় করলেও শেষ পর্যন্ত তিনি আর সংগঠিত হতে পারেননি। এমন এক দিনে ক্লান্ত রাজিয়া যাযাবরের মত ঘুরে ঘুরে এক কৃষকের বাড়িতে আশ্রয় নেন। ক্ষুধার্ত রাজিয়া এক পর্যায়ে ঘুমিয়ে পড়লে ঐ কৃষক তার রাজকীয় রত্নাদি চুরি করতে গিয়ে তাকে হত্যা করে। আর এরই সাথে সমাপ্তি হয় সুলতানা রাজিয়ার ঝঞ্জাবিক্ষুব্ধ এক জীবনের। ভারতের প্রথম নারী শাসককে ইতিহাস মনে রেখেছে বেশ অবহেলায়।

তথ্যসূত্র
বাংলাদেশের ইতিহাস-রমেশচন্দ্র মজুমদার
মোগল সাম্রাজ্যের সোনালি অধ্যায়- সাহাদত হোসেন খান
https://bn.m.wikipedia.org/wiki/রাজিয়া_সুলতানা

লেখকঃ উবায়দুর রহমান রাজু