ব্যাক্তিত্ব

উপমহাদেশে বাঘ শিকারের ইতিহাস এবং আমাদের পচাব্দী গাজী

ব্যাক্তিত্ব রবিবার, ২৭ জানুয়ারী ২০১৯ ০৫:৫৮:১৪

উপমহাদেশে বাঘ হত্যার মাধ্যমে শৌর্য্য প্রকাশের বা বীরত্বের গল্প কম নেই।  বাঘ হত্যার ইতিহাস ঘাঁটাঘাঁটি করে দেখা যায়, ১৬১৭ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট জাহাঙ্গীর ৮৭টি বাঘ শিকার করেন। ওই বছর স্বামীর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সম্রাজ্ঞী নূরজাহান এক দিনের ব্যবধানে মধ্য প্রদেশের মান্তু দুর্গের কাছে চারটি বাঘ হত্যা করেন। রেল কর্মকর্তা ব্রিটিশ শ্বেতাঙ্গ শিকারি ডাব্লিউ রাইস ১৮৫০ থেকে ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে চার বছরে ১৫৮টি বাঘ শিকার করেন। ১৮৬৩ থেকে ১৮৬৪ খ্রিস্টাব্দে মাত্র দুই বছরে নর্মদা নদীর পাশ থেকে ৭৩টি বাঘ শিকার করেন আরেক ব্রিটিশ শিকারি আর গর্ডন কামিং। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে মধ্য প্রদেশের বনাঞ্চল থেকে ৬০০টি বাঘ শিকার করেন আরেক ব্রিটিশ শিকারি বি সাইমন। ১৯০৩ সালে ব্রিটিশ শিকারি মন্টেগু জিরার্ড মধ্য ভারত ও হায়দরাবাদ থেকে ২২৭টি বাঘ শিকার করেন। মহারাজা স্যার গুর্জার ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত ১১৫০টি বাঘ শিকার করেন। গুর্জারের দেখাদেখি উদয়পুরের মহারাজা ফতে সিং এক হাজারটি বাঘ হত্যা করেন। এ সময় গোয়ালিওর মহারাজা মাধো রাও সিন্ধিয়া ৮০০, রেওয়ার মহারাজা গুলাব সিং ৬১৬, কুচবিহারের মহারাজা নৃপেন্দ্র নারায়ণ ৩৭০টি বাঘ শিকার করেছেন। কিন্তু এগুলো ছিল নির্বিচার হত্যাকাণ্ড, বিনা অপরাধে শুধু রাজরাজড়াদের খেয়াল মেটাতে বেঘোরে প্রাণ দিয়েছে এসব বাঘ। তাঁরা কেউ মানুষখেকো বাঘ হত্যা করেননি। হত্যা করেননি ডোরাকাটা দুর্ধর্ষ রয়েল বেঙ্গল টাইগার। শিকার করেননি পচাব্দী গাজীর মতো ১২ ফুট লম্বা রয়েল বেঙ্গল টাইগার। ওই শিকারিরা মেছো বাঘ, চিতা বাঘ কিংবা জঙ্গলের স্বাধীন বাঘের মতো প্রাণী পাইক-পেয়াদা নিয়ে হত্যা করে উল্লাস করেছেন, বাঘ শিকারের ইতিহাসে নিজেদের নাম লিখিয়েছেন। কিন্তু গ্রামের একজন সহজ-সরল মানুষ, যিনি নিজের বুদ্ধিমত্তায় পাকিস্তানের তৈরি একনলা সেকেন্দার বন্দুক দিয়ে ২৩টি মানুষখেকো, সব মিলিয়ে ৫৭টি রয়েল বেঙ্গল টাইগার হত্যা করে নতুন এক ইতিহাস গড়েছেন, তাঁর কথা আমরা কজনই আর মনে রেখেছি!

বাংলাদেশের বিখ্যাত বাঘ শিকারী পচাব্দী গাজী ১৯২৪ সালে জন্মগ্রহন করেন। সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার শরা গ্রামের এক ঐতিহ্যবাহী শিকারী পরিবারে তাঁর জন্ম। পিতা মেহের গাজী, পিতামহ ইসমাইল গাজী এবং দুই পিতৃব্যও ছিলেন খ্যাতনামা শিকারী। ১৯৪১ সালে মাত্র সতেরো বছর বয়সে  খুলনা জেলার পাইকগাছা থানার ‘গোলখালির সন্ত্রাস’ নামে পরিচিত একটি বাঘ হত্যা করার মাধ্যমে পচাব্দী গাজীর শিকারী জীবন শুরু হয়। শিকারের জন্য উত্তরাধিকার সূত্রে তিনি লাভ করেন পিতার ডাবল বেরেল মাজল-লোডিং বন্দুকটি।

সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় জন্মগ্রহণ করায় বন্যজীবন ছিল পচাব্দী গাজীর জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। শুধুমাত্র জীবন রক্ষার প্রয়োজনেই তিনি পুরনো আমলের একটি বন্দুক নিয়ে হিংস্র প্রাণীদের বিরুদ্ধে লড়াই করতেন অসীম সাহস, ধৈর্য্য ও বুদ্ধিমত্তা নিয়ে। প্রথম প্রথম তিনি বনবিভাগের রেঞ্জারের সহযোগী হিসেবে শিকার করতেন। পশুশিকারে তাঁর বুদ্ধিমত্তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়লে তৎকালীন বনকর্মকর্তার উদ্যোগে ১৯৫৫ সালে তিনি বনবিভাগের অধীনে বনপ্রহরীর কাজে যোগদান করেন। এ কাজে যোগদানের পরপরই শুরু হয় দুর্ধর্ষ বাঘের সঙ্গে তাঁর বিচিত্র লড়াইয়ের লোমহর্ষক জীবনের এক নতুন অধ্যায়। সুন্দরবনের  বাওয়ালি, মউয়াল, মাঝি ও জেলেদের জীবনরক্ষায় পচাব্দী গাজী অবতীর্ণ হন মুক্তিদাতার ভূমিকায় এবং রক্ষা করেন অজস্র শ্রমিকের প্রাণ। তাঁর এই কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তৎকালীন পাকিস্তান সরকার ১৯৬৮ সালে তাঁকে ‘সনদ-ই-খেদমত’ জাতীয় পুরস্কারে ভূষিত করে।

পচাব্দী গাজীর বাঘ শিকার করার কৌশল ছিল অন্যদের থেকে স্বতন্ত্র। বাঘকে বশীভূত করার উদ্দেশ্যে তিনি অলৌকিক পদ্ধতির পরিবর্তে আত্মোদ্ভাবিত বিভিন্ন কৌশল, গভীর ধীশক্তি ও প্রযুক্তির আশ্রয় নিতেন। তিনি পাগমার্ক দেখে বাঘের আকৃতি অনুধাবন করতে পারতেন। তাছাড়া পদচ্ছাপ দেখে পশুর শ্রেণি এবং তার গতিবিধি নির্ণয়েও তিনি দক্ষ ছিলেন। বাঘের গতিবিধি চিহ্নিতকরণে তিনি কখনও দিন-রাত পর্যবেক্ষণে থাকতেন। তিনি নিরস্ত্র অবস্থায়ও হিংস্র প্রাণীদের সঙ্গে লড়েছেন। বাঘিনীর ডাক, গাছ কাটার শব্দ কিংবা পাতা সংগ্রহের শব্দ নকল করে তিনি বাঘকে প্রলুব্ধ করতেন। জঙ্গলে কল পেতে কিংবা ১৫ হাত উঁচু মাচান তৈরি করেও তিনি শিকার করতেন। শরৎ, হেমন্ত ও বসন্তের পূর্ণিমা-অমাবস্যা হচ্ছে বাঘের প্রজনন সময়। স্থানীয় ভাষায় একে বলে ‘স্যাঁড়াসাঁড়ির কোটাল’। এ সময় পচাব্দী গাজী বাঘিনীর ডাক নকল করে পাগলপ্রায় মিলনোন্মত্ত বাঘকে হত্যা করতেন।

পচাব্দী গাজীর বাঘ শিকারের আরও দুটি পদ্ধতি হলো ‘গাছাল’ ও ‘মাঠাল’। গাছাল হলো গাছে চড়ে শিকার, আর মাঠাল হলো জঙ্গলের ভিতর চলতে চলতে শিকার। মাঠাল পদ্ধতিতে শিকার করে তিনি একটি দো-নলা বন্দুক পুরস্কার পান। সাতক্ষীরা বা বুড়ি গোয়ালিনী ফরেস্ট রেঞ্জে ‘আঠারোবেকি’ এলাকায় ‘টোপ’ পদ্ধতিতে তিনি যে বাঘটি হত্যা করেন সেটি ছিল সুন্দরবনের শিকারের ইতিহাসে দীর্ঘতম বাঘ প্রায় ১২ ফুট দীর্ঘ। এরপর ‘তালপট্টির সন্ত্রাস’ নামে খ্যাত বাঘ শিকার ছিল পচাব্দী গাজীর জীবনের ৫৭তম ও শেষ শিকার। তাঁর পিতা মেহের গাজী ৫০টি বাঘ শিকার করার গৌরব অর্জন করেছিলেন। পুত্র তার চেয়ে সাতটি বেশি মেরে বাঘ শিকারের ইতিহাসে এক কিংবদন্তিতে পরিণত হন।

পচাব্দীর বাবা ও দাদা দুজনই বাঘের আক্রমণে নিহত হন। মেহের গাজী "শিঙ্গের গোলখালীর" মানুষখেকো মারতে যেয়ে আহত হন ও পঙ্গুত্ব বরণ করেন। এ ঘটনায় পচাব্দী গাজীর চাচা নিজামদী গাজিও আহত হন ও পঙ্গুত্ব বরণ করেন। তিনি পরবর্তীতে সুপতির মানুষখেকো মারতে যেয়ে গুরুতর আহত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। গোলখালীর ও সুপতির দুটো মানুষখেকোই পরবর্তীকালে পচাব্দী গাজীর হাতে মারা পড়ে।

পচাব্দী গাজী মোট ৫৭টি বাঘ শিকার করেন।  তার মধ্যে অন্তত ২৩ টি ছিল মানুষখেকো বাঘ। পচাব্দী গাজীর শিকারকৃত উল্লেখযোগ্য কিছু মানুষখেকো বাঘ হলঃ

১।  সুপতির মানুষখেকো বাঘ।
২। গোলখালীর মানুষখেকো বাঘ।
৩। দুবলার চরের মানুষখেকো বাঘ।
৪। লক্ষীখালের মানুষখেকো বাঘ।
৫। আঠারোবেকীর মানুষখেকো বাঘ।
৬। তালপাটির মানুষখেকো বাঘ।
৭। লতাবেকী-ইলশামারীর বাঘ।

আমরা জিম করবেটের শিকারের গল্প পড়ে বুঁদ হয়ে থাকি, কিন্তু কজনই বা জানি আমাদের বাংলাদেশের এ বিখ্যাত শিকারীর নাম এবং তার বীরত্বের ঘটনা! পচাব্দী গাজী আমাদের নিজেদের বীর, তার শিকারের ঘটনাগুলো নিঃসন্দেহে আমাদের গর্বিত করে।

সূত্রঃ বাংলাপেডিয়া, উইকিপিডিয়া এবং দৈনিক কালের কন্ঠ