ব্যাক্তিত্ব

ইন্দ্রলাল রায়- প্রথম বাঙালি ফাইটার পাইলট

ব্যাক্তিত্ব রবিবার, ০৫ আগস্ট ২০১৮ ০৮:১৯:৪০

১৯১৮ সালের ১৯ জুলাই, প্রথম মহাযুদ্ধ চলছে। ফ্রান্সের আকাশে জার্মান বিমানবাহিনী ও ব্রিটিশ রাজকীয় বিমানবাহিনী তুমুল আকাশযুদ্ধে লিপ্ত। রাজকীয় বিমানবাহিনীর ১৯ বছর বয়সী এক তরুণ ফাইটার পাইলট সেদিন ডগফাইটের সময় একটি জার্মান জঙ্গি বিমান গুলি করে ভূপাতিত করলেন। এটি ছিল তার দশম শত্রু বিমান শিকার, যে কৃতিত্বের জন্য তিনি পেয়েছিলেন ‘ফ্লাইং এইস’ খেতাব। এই খেতাব পাওয়ার জন্য যেখানে সাধারণত পাঁচটি শত্র“ বিমান ঘায়েল করাই যথেষ্ট, সেখানে তিনি ধ্বংস করেছিলেন ১০টি বিমান। আকাশযুদ্ধের সেই প্রথম যুগে, সদ্য যুবক এক ফাইটার পাইলটের মাত্র ১৩ দিনের ১৭০ উড়াল-ঘণ্টার এক অতি সংক্ষিপ্ত লড়াই জীবনের পক্ষে এটি ছিল এক অসামান্য বীরত্বপূর্ণ কৃতিত্ব। এই ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। এই অকুতোভয় বীরসেনানির নাম ইন্দ্রলাল রায় প্রথম বাঙালি ফাইটার পাইলট এবং প্রথম বাঙালি বা ভারতীয় ‘ফ্লাইং এইস’ (Flying Ace)।

তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তির পক্ষে যুদ্ধ করেন এবং মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ফ্রান্সের পক্ষ হয়ে জার্মানির বিপক্ষে বেশ কয়েকটি সামরিক অভিযানে অংশ নেন এবং যুদ্ধবিমান চালনায় দক্ষতার পরিচয় দেন। তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী একমাত্র ভারতীয় বৈমানিক।

ইন্দ্রলাল রায় (ডিসেম্বর ২, ১৮৯৮ - জুলাই ১৮, ১৯১৮) প্রথম বাঙালি বিমান চালক। ১৮৯৮ সালের ২ ডিসেম্বর তিনি কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন।  বরিশাল জেলার লাকুতিয়ার জমিদার ব্যারিষ্টার  পিএল রায় ও মা নলিতা রায়ের দ্বিতীয় ছেলে ইন্দ্রলাল। ইন্দ্ররা ছিল তিন ভাই। কলকাতার শিক্ষাজীবনের শুরুতেই ১৯০৮ সালে ইন্দ্রলাল মামা-বাবা ও ভাইদের সঙ্গে ১০ বছর বয়সে ইংল্যান্ড চলে যান।

প্রাথমিক জীবন
শিক্ষা জীবনের প্রথম থেকেই উজ্জ্বল মেধার পরিচয় দেন এবং বেশ কয়েকটি বৃত্তি অর্জন করেন। বৈমানিক হিসেবে যোগদানের আগে তিনি সর্বশেষ ব্যালিওল বৃত্তি লাভ করেন। এই বৃত্তি নিয়ে তিনি ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে যান। ১৯১১ সাল পর্যন্ত তিনি কেনিংস্টন-এর সেন্টা পল'স স্কুল-এ পড়াশোনা করেন। তার মূল শিক্ষার প্রায় পুরোভাগই ইংল্যান্ডে।

পরিবারের সবার আশা ছিল তিনি ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস বা আইসিএস-এ যোগ দেবেন। কিন্তু তা না করে তিনি ১৯১৭ সালের এপ্রিল মাসে যোগ দেন রয়েল ফ্লাইং কোর-এ। এই ফ্লাইং কোর থেকে ১৯১৭ সালের জুলাই ৫ ইং তারিখে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে কমিশন লাভ করেন। এর এক সপ্তাহের মধ্যে ভেন্ড্রোম-এ প্রশিক্ষণ শুরু করেন। এরপর টার্নবারি-তে বন্দুক চালনা শিক্ষা করেন। অক্টোবর মাসের শেষের দিকে বিমান বাহিনীর ৫৬ স্কোয়াড্রনে যোগ দেন।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ:
মেধাবী ইন্দ্রলালের ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসে যোগদানের ইচ্ছে থাকলেও প্রথম বিশ্বযুদ্ধ তার জীবনের পথ পরিবর্তন করে দেয়। কৈশোরের প্রিয় বিষয় বিমান এবং যুদ্ধ তার মনকে পরিবর্তন করে দেয়। সামরিক বাহিনীতে যোগদানের বয়স পেরোনের সঙ্গে সঙ্গে ইন্দ্রলাল রাজকীয় বিমান বাহিনীতে যোগদানের আবেদন করেন। সে যুগে একজন ভারতীয় নাগরিকের রাজকীয় বিমান বাহিনীতে যোগদান ছিল প্রায় অসম্ভব বিষয়। মনে করা হয়, ইন্দ্রলাল রায় সম্ভবত মেজর জেনারেল ও পরবর্তীতে এয়ার ভাইস মার্শাল সেফটন ব্রানকারের কাছ থেকে একটি সুপারিশপত্র সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন, যা তার রাজকীয় বিমান বাহিনীতে যোগদানের পথ সহজ করে দিয়েছিল।

ইন্দ্রলাল ১৯১৭ এর ৫ জুলাই সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে বিমান বাহিনীতে যোগদান করেন এবং পরপরই ফ্রান্সের ভেনডম ও স্কটল্যান্ডের টার্নবেরিতে প্রশিক্ষণ নেন। প্রশিক্ষণ শেষে ফ্রান্সে ৫৬তম স্কোয়াড্রনে ৩০ অক্টোবর যোগদান করেন। দুই মাস পরে ৬ ডিসেম্বর নিয়মিত একটি রুটিন ফ্লাইট চলাকালে ইন্দ্রলালের বিমানটি দুর্ঘটনায় পতিত হয়। বিমানসহ তিনি গিয়ে পড়েছিলেন যুদ্ধরত ব্রিটিশ এবং জার্মান ফ্রন্টের মধ্যবর্তী নোম্যান্স ল্যান্ডে। সেখানে তিনি তিন দিন পড়েছিলেন সম্পূর্ণ অচেতন অবস্থায়। তিন দিন পর ব্রিটিশ বাহিনীর সেনা সদস্যরা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়।

এ যাত্রায় প্রাণে বেঁচে যাওয়া ইন্দ্রলালকে বেশ কয়েক মাস সুস্থ হওয়ার জন্য হাসপাতালে কাটাতে হয়। এ সময় তিনি নানা বিমানের বেশ কিছু ছবি এঁকেছিলেন, যার কিছু আজও টিকে আছে। আরোগ্য লাভের পর ইন্দ্রলাল রায় ৪০তম স্কোয়াড্রনে যোগদান করলেন। তারিখটি ছিল ১৯ জুলাই ১৯১৮।

আকাশযুদ্ধ ও সাফল্য:
আকাশযুদ্ধে তাঁর প্রথম সাফল্য আসে ৬ জুলাই ১৯১৮ তারিখে একটি জার্মান জঙ্গীবিমান ধ্বংস করার মাধ্যমে। এরপর তিনি ৮ জুলাই তারিখে চার ঘন্টায় তিনটি; ১৩ জুলাই দুইটি; ১৫ জুলাই দুইটি; এবং ১৮ জুলাই তারিখে একটি শত্রুবিমান ধ্বংস করেন। তাঁর সবশেষ সাফল্য আসে ১৯ জুলাই তারিখে। ৬ থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত মাত্র তের দিনে দশটি শত্রুবিমান ঘায়েল করে তিনি ঠাঁই পেয়ে যান ইতিহাসের পাতায়।

এর তিন দিন পর, ২২ জুলাই ১৯১৮ তারিখে ফ্রান্সের আকাশে জার্মান বিমানবাহিনীর সাথে এক সম্মুখ যুদ্ধে তাঁর এসই-৫এ বিমানটি ফ্রান্সের জার্মান অধিকৃত এলাকায় বিধ্বস্ত হয়। জার্মান সেনারা তাঁর মৃতদেহ উদ্ধার করে সেখানেই(ফ্রান্সের কার্ভিনে) সমাহিত করে। কথিত আছে, তাঁর অসাধারণ বীরত্বের কথা মনে রেখে সেই জার্মান শত্রুসেনারাও তিনি যেখানে পতিত হয়েছিলেন, সেখানে ফুলের তোড়া রেখে আসে।

তিনি মাত্র ১৪ দিনের মধ্যে  ১০টি শত্রু বিমান ঘায়েল করেছিলেন, যা বিস্ময়কর।

৪০তম স্কোয়াড্রনের কমান্ডিং অফিসার মেজর এলেঙ্ ডবিস্নউ. কের ২৭ জুলাই ইন্দ্রলালের মা-বাবাকে একটি চিঠি লেখেন- 'আপনার ছেলের বিষয়ে আমি যতটা জেনেছি, তা লিখছি। তিনি (ইন্দ্রলাল) তার তিনজন সতীর্থকে নিয়ে টহল দিতে আকাশে ওড়েন এবং চারটি জার্মান বিমানের মোকাবিলা করেন। দুটি জার্মানি বিমান ও আমাদের একটি বিমান ভূপাতিত হয়। আমাদের বিধ্বস্ত বিমানের বৈমানিক ছিলেন আপনার পুত্র।'

ব্রিটিশ রাজকীয় বিমান বাহিনীর প্রথম ব্রিগেডের কমান্ডিং ব্রিগেডিয়ার ডিলেজি পিচার ইন্দ্রলাল রায়ের স্বল্প সময়ের এমন দুর্লভ বীরত্বপূর্ণ ও অনন্য সাধারণ কৃতিত্বের জন্য বিমান বাহিনীর সর্বোচ্চ বীরত্বের খেতাব ডিস্টিংগুইসড ফ্লাইং ক্রস প্রদানের সুপারিশ করে লিখলেন-

'তিনি (ইন্দ্রলাল) নিপুণতা ও সাহসিকতার এক উৎকৃষ্ট উদাহরণ তৈরি করেছেন এবং তিনি একজন প্রকৃত আক্রমণাত্মক সাহসী সত্তার অধিকারী, যিনি ১৩ দিনে (প্রকৃতপক্ষে ১৪ দিন) ৯টি (প্রকৃত পক্ষে ১০টি বিমান এবং ১০ম বিমানটি পরবর্তীতে স্বীকৃত হয়) শত্রু বিমান ধ্বংস করেছিলেন।'

১৯১৮ এর সেপ্টেম্বরে ব্রিটিশ সরকার ইন্দ্রলাল রায়কে রাজকীয় বিমান বাহিনীর সর্বোচ্চ খেতাব ডিস্টিংগুইসড ফ্লাইং ক্রস (উঋঈ) পদকে ভূষিত করে। ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তিনিই প্রথম ও একমাত্র বৈমানিক, যিনি এ পদক পেয়েছিলেন।

ইন্দ্রলাল রায়ের সাহসিকতা ও দক্ষতাকে তার কমান্ডিং অফিসার মেজর এলেঙ্ চিঠিতে এভাবেই বর্ণনা করেছিলেন:

'যখন থেকে আপনার ছেলে আমাদের স্কোয়াড্রনে যোগদান করেন তখন থেকেই তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ছিল শত্রুর বিমান ভূপাতিত করা। তিনি ছিলেন বিস্ময়কর রকমের সাহসী এবং সুদক্ষ পাইলট।'

ইন্দ্রলাল রায়কে ইস্টভিল কমিউনাল সেমিস্ট্রিতে সমাহিত করা হয়েছিল। লন্ডনে একটি সড়কের নাম ইন্দ্রলাল রায়ের নামে রাখা হয়েছে। ইন্দ্রলালের ফ্লাই লগবুক, ব্যাগ, তার অাঁকা স্কেচগুলো, সম্রাট পঞ্চম জর্জ ও ৪০তম কমান্ডিং অফিসারের লেখা চিঠিসহ নানা নিদর্শন দিল্লীর ভারতীয় বিমান বাহিনীর জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে।

সম্মাননা:
একেবারে অল্প বয়সেই বিমান যুদ্ধে তিনি অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেন। মৃত্যুর সময় তার বয়স ছিল মাত্র ২০ বছর। এই সাফল্যের জন্য ইংল্যান্ড সরকার তাকে মরণোত্তর ডিস্টিংগুইশ্‌ড ফ্লাইং ক্রস (Distinguished Flying Cross - ডিএফসি) সম্মানে ভূষিত করে।

শেষ কথা:
ইন্দ্রলাল রায়ের মৃত্যু সংবাদে ভারতে বিশেষ করে বাঙালিরা যেমন শোকাতুর হয়েছিলেন তেমনি তার বীরত্বের জন্য হয়েছিলেন গর্বিত। ভারত সরকার ১৯৯৮ সালের ডিসেম্বরে ইন্দ্রলাল রায়ের জন্মশতবার্ষিকীতে স্মারক ডাকটিকেট প্রকাশ করে। এছাড়া ফ্রান্সে তাঁর সমাধির ওপর বাংলা ও ফরাসি ভাষায় গৌরবগাঁথা লেখা হয়। তাঁর নামে কলকাতায় একটি সড়কও রয়েছে।

সূত্রঃ এইবেলা