
ক্রিকেটের ইতিহাসে যে পাঁচ জন বোলার হ্যাট্রিকে অন্য সবার চেয়ে এগিয়ে
ক্রিকেট খেলা হচ্ছে ব্যাট-বলের লড়াইয়ের খেলা। যে দল ভালো খেলবে সেই দল জিতবে। আর এই ভালো খেলার পিছনে যেমন রয়েছে অসাধারণ ফিল্ডিং কিংবা ব্যাটিং নৈপুণ্য ঠিক তেমনি রয়েছে বুদ্ধিদীপ্ত বোলিং। এক ওভারে পরপর তিন বলে ৩ উইকেট নিলে তাকে হ্যাট্রিক বলে। তো বুঝতেই পারছেন একটি হ্যাট্রিক হওয়া কতটা কঠিন ব্যাপার!
কোন খেলোয়াড় তার ক্যারিয়ারে একটি হ্যাট্রিক হয়তো ভাগ্যদেবীর করুণায় পেয়ে যেতে পারেন কিন্তু ক্যারিয়ারে একাধিক হ্যাট্রিক করা সেটা নিশ্চই সুপ্রসন্ন ভাগ্য আর বুদ্ধিদীপ্ত বোলিং করার কারনেই সম্ভব হয়। আর যারা হ্যাট্রিকের মতো ঘটনাকে বারবার জন্ম দেয়, তারা নিঃসন্দেহে অনেক প্রতিভাবান ও বড় মাপের খেলোয়াড় ।
১৮৭৯ সালের ২রা জানুয়ারি ক্রিকেটের ইতিহাসে প্রথম হ্যাট্রিক করার গৌরব অর্জন করেন অস্ট্রেলিয়ান বোলার ফ্রেড স্পোফোর্থ। আজ আপনাদের কে পরিচিত করাবো এমন কয়েকজন ক্রিকেটারদের সাথে যারা ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অধিক সংখ্যক হ্যাট্রিক করেছেন ।
১. ওয়াসিম আকরাম (পাকিস্তান)
ওয়াসিম আকরাম ক্রিকেটে খুবই পরিচিত একটা নাম। যার বলের দুর্দান্ত বাউন্স আর সুইংয়ে মুহূর্তেই কাবু হয়ে যেতেন বিশ্বের সেরা সেরা ব্যাটসম্যান। তাকে পাকিস্তান ক্রিকেটের জীবন্ত কিংবদন্তি হিসেবে ভাবা হয়। অন্য বোলারদের চেয়ে তিনি অধিকসংখ্যক হ্যাট্রিক করেছেন বিধায় তাকে হ্যাট্রিকের রাজাও বলা হয়। বোলিং ক্যারিয়ারে, প্রথম শ্রেনির ক্রিকেট ও লিস্ট 'এ' ক্রিকেটের প্রত্যেকটিতে ৩টি করে অবিশ্বাস্য হ্যাট্রিকের রেকর্ড আছে। পাশাপাশি টেস্ট ও একদিনের পঞ্চাশ ওভারের ম্যাচের মাধ্যমেও এই ক্রিকেট বিশ্বকে দেখিয়েছেন তার হ্যাট্রিকের ঝলক।
তিনি ১৯৮৮ সালে ঘরোয়া ক্রিকেটের মর্যাদাপূর্ণ লীগ, ইংল্যান্ডের কাউন্টি লিগে ল্যাংকাশায়ারের হয়ে সারের বিপক্ষে হ্যাট্রিক করেন। এছাড়াও তিনি ১৯৮৯-৯০ মৌসুমে পাকিস্তানের ঘরোয়া ক্রিকেট লীগে পিআইএ(PIA) ও পিএসিও(PACO) ম্যাচে হ্যাট্রিক করেন। তাছাড়া দু'টি টেস্ট হ্যাট্রিকের মাধ্যমে তিনি যৌথভাবে হিউ ট্রাম্বল ও জিমি ম্যাথিউসের সাথে নাম লিখান । ওয়াসিম আকরাম খুবই বিস্ময়কর ভাবে পরপর দুই ম্যাচে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে হ্যাট্রিক পান, একটি লাহোরে ১৯৮৮ সালে এবং অন্যটি ১৯৯৯ সালে ঢাকায়।
কলকাতা নাইট রাইডার্সের সাবেক এই কোচ প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য, কারন তিনি তার নিজ কৃতিত্বে সারজায় একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচে অস্ট্রেলিয়া ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে হ্যাট্রিক করেন যেটা তার ক্রিকেট ক্যারিয়ারে অনন্য হয়ে থাকবে। একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচে তার দুটি হ্যাট্রিকের শিকার হওয়া ৬জন ব্যাটসম্যানই কিন্তু পরিষ্কারভাবে বোল্ড আউট হন। মজার বিষয় হলো তার বোলিং ক্যারিয়ারে তিনি আরও দুইয়ের অধিক হ্যাট্রিক তার নামের পাশে বসাতে পারতেন কিন্তু তিনি তা হাতছাড়া করেন। তবুও এই কিংবদন্তি বোলার কে মনে রাখবে ক্রিকেট বিশ্ব তার সাফল্য আর ধ্রুপদী হ্যাট্রিকের জন্য।
২. ডগ রাইট (ইংল্যান্ড)
এখন পর্যন্ত ডগ রাইটই একমাত্র বোলার যার কিনা প্রথম শ্রেনির ক্রিকেটে সর্ব্বোচ্চ সাতটি হ্যাট্রিক আছে ! ক্রিকেটের কিংবদন্তি স্যার ডন ব্রাডম্যান একবার তাকে শ্রেষ্ট লেগ স্পিন বোলার হিসেবেও আখ্যায়িত করেছেন। টেস্টে ডগ রাইটের অভিষেক ঘটে ১৯৩৮ সালে ইংল্যান্ডের ট্রেন্ট ব্রিজে । তিনি অভিষেক ম্যাচেই তার চমৎকার বোলিংয়ের মাধ্যমে মুগ্ধ করেন দর্শকদের। যদিও তিনি জাতীয় দলের হয়ে বেশি ম্যাচ খেলতে পারেন নি। তবে জাতীয় দলের হয়ে তার ৩৪ টেস্টে ১০৮ টি উইকেট তুলে নেওয়ার রেকর্ড আছে। তিনি প্রথম শ্রেনির ক্রিকেট ক্যারিয়ারে ৪৯৭টি ম্যাচ খেলে তার অর্জনের ঝুলিতে জমা করেন ২০৫৬টি উইকেট।
হ্যার্ল্ড গিবস , জোসেফ হর্টন এবং বার্নাডের মতো ব্যাটসম্যানরা ছিলেন তার ১ম নিবন্ধিত ১ম শ্রেনি ক্রিকেটের হ্যাট্রিকের শিকার। আর সেই ম্যাচে মাত্র ২৭ রান খরচ করে ৭ জন ব্যাটসম্যান কে সাঝঘরে ফিরিয়ে দলের জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এই বোলার। প্রথম হ্যাট্রিকের ২৫ দিনের মধ্যেই নটিংহ্যামশায়ারের বিপক্ষে দ্বিতীয় হ্যাট্রিকের দেখা পান এই ইংলিশ বোলার । গ্লুচেস্টারশায়ারের বিপক্ষে আসে তৃতীয় হ্যাট্রিক। ইস্ট লন্ডনে বর্ডারের বিপক্ষে চমৎকার বোলিং নৈপুণ্যের মাধ্যমে ওয়াইট ফিল্ড, ডেরেক ডউলিন, স্ট্যানলি ওয়াইটের মতো ব্যাটসম্যানদের পরাস্ত করে চতুর্থ হ্যাট্রিকের দেখা পান এই খেলোয়াড়।
তার বিস্ময়কর হ্যাট্রিকের ধারা অবিরাম চলছিলো। পঞ্চম হ্যাট্রিকটি ছিল গ্লুচেস্টারশায়ারের বিপক্ষে ক্যারিয়ার সেরা বোলিং ফিগার নিয়ে। সেই ম্যাচে মাত্র ৪৭ রান খরচ করে তিনি ৯টি উইকেট লাভ করতে সক্ষম হন । ১৯৫৭ সালে ক্রিকেট থেকে বিদায় নেন প্রথম শ্রেনি ক্রিকেটের এই বিখ্যাত বোলার । বিদায় নেওয়ার আগে সাসেক্স ও হ্যাম্পাশায়ারের বিপক্ষে ক্যারিয়ারের ষষ্ট ও সপ্তম হ্যাট্রিক পরিপূর্ণ করেন এই ইংলিশ ক্রিকেটার।
৩. টম গডার্ড (ইংল্যান্ড)
ইংল্যান্ডের এই খেলোয়াড়ের পুরো নাম টমাস উইলিয়াম জন গডার্ড । শুনে অবাক হওয়ার বিষয়, প্রথম শ্রেনির ক্রিকেটে তার দখলে আছে ৬টি হ্যাট্রিক ! প্রথম শ্রেনির ক্রিকেটের ইতিহাসে উইল ফ্রেড রোডস,টিক ফ্রিম্যান, পার্কার ও জ্যাক হর্নের মতো বিখ্যাত সব বোলারের পরেই পঞ্চম সর্বোচ্চ উইকেটের মালিক এই ইংলিশ বোলার। তার বোলিং ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিলো একজন ফাস্ট বোলার হিসেবে কিন্তু ফাস্ট বোলার হিসেবে বেশি সাফল্য না পাওয়ায় ৬ ফুট ৩ ইঞ্চির এই দীর্ঘদেহী বোলার অফ স্পিনার হয়ে যান।
এই ইংলিশ বোলারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তিনি সবুজ উইকেটে ও ভালোভাবে বল ঘুরাতে পারদর্শী ছিলেন। টম গডার্ড প্রথম শ্রেনির ক্রিকেটে ৫৯৩ টি ম্যাচ খেলে ২৯৭৯টি উইকেট লাভ করতে সক্ষম হন। দেশের হয়ে ৮টি টেস্ট ম্যাচ খেলে ২২ উইকেট লাভ করতে সমর্থ হন এই ইংলিশ ক্রিকেটার ।
তিনি ক্যারিয়ারের অধিকাংশ সময় পার করেছেন গ্লুচেস্টারশায়ারের হয়ে খেলে । গ্লুচেস্টারশায়ারের হয়ে এই স্পিন বোলারের আছে ৪টি নজরকাড়া হ্যাট্রিক । আর সেইসব হ্যাট্রিক গুলো হচ্ছে ১৯২৪ সালে সাসেক্সের বিপক্ষে, ১৯৩০ ও ১৯৪৭ সালে গ্ল্যামার্গানের বিপক্ষে এবং ১৯৪৭ সালে সামারসেটের বিপক্ষে। তিনি ১৯৩৮-৩৯ সালে এমসিসির(MCC) হয়ে রোজেসিয়ার বিপক্ষেও হ্যাট্রিক করেন। চার্লি পার্কারের সাথে টম গডার্ড একহয়ে মারাত্মকভাবে বোলিং করতেন। প্রতিপক্ষের শিবিরে তাদের বোলিং নৈপুণ্য দিয়ে কাঁপন ধরিয়ে দিতেন। চার্লি পার্কারের মতো তাকেও গ্লুচেস্টারশায়ারের একজন কিংবদন্তি খেলোয়াড় হিসেবে ভাবা হয়।
৪. লাসিথ মালিঙ্গা (শ্রীলঙ্কা)
সেপারামাদু লাসিথ মালিঙ্গা, ঝাঁকড়া চুলের অধিকারী শ্রীলঙ্কান এই ফাস্ট বোলার যেদিন বল হাতে জ্বলে উঠতেন সেদিন প্রতিপক্ষের শিবিরকে তছনছ করে দিতেন। একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তিনিই একমাত্র বোলার যার দখলে আছে তিনটি হ্যাট্রিক। এই তিনটি হ্যাট্রিকের দু'টিই করেছেন বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে। তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রথম হ্যাট্রিকের দেখা পান ২০০৭ সালের বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে।
পরের হ্যাট্রিকটি করেন কেনিয়ার বিপক্ষে ২০১১ সালের বিশ্বকাপে। তৃতীয় হ্যাট্রিকটি করেন সফরকারী অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে কলোম্বোতে। একটি মজার ঘটনা হলো, কেনিয়ার বিপক্ষে তৃতীয় উইকেট অর্থাৎ তার ৩য় শিকার 'সেম নচে' কেনিয়ার হয়ে তিন ইনিংসে তিনটি বল খেলেছেন এবং তিন বারই প্রথম বলে আউট হয়েছেন। আরো অবিশ্বাস্য ব্যাপার যে, মালিঙ্গাই একমাত্র বোলার, যার দখলে একদিনের বিশ্বকাপে দুটি হ্যাট্রিক আছে। তাছাড়া লাসিথ মালিঙ্গা টি-টুয়েন্টি ফর্মেটে একজন শ্রীলঙ্কান বোলার হিসেবে অধিক সফল বোলার।
৫. অমিত মিশ্র (ভারত)
ভারতের বিস্ময়কর লেগি বোলারদের মধ্যে অমিত মিশ্র হলেন অন্যতম । যার বলের ঘূর্ণিতে মূহুর্তেই কাবু হয়ে যান যে কোন ব্যাটসম্যান। তিনি আইপিএলের মতো বড় আসরে তিনটি হ্যাট্রিক করেন,যা আইপিএলের ইতিহাসে প্রথম। এই রেকর্ডটি শুধু আইপিএলেই সীমাবদ্ধ নয় বরং ২০ ওভারের সীমিত খেলার সংস্করনেও বিরল। তবে একটি বিষয় খুব মজার হচ্ছে, এই হ্যাট্রিকগুলো আইপিএলের তিন আসরে ভিন্ন তিনটি দলের হয়ে করেছেন এই ডানহাতি লেগ ব্রেক বোলার। এছাড়াও ভারতের ঘরোয়া ক্রিকেট লিগ রঞ্জি ট্রফিতে হরিয়ানা দলের হয়ে হিমাচল প্রদেশের বিপক্ষে অসাধারণ হ্যাট্রিক করার রেকর্ড আছে তার।
২০০৮ সালে মার্চের ১৫ তারিখ ফিরোজশাহ কোটলা স্টেডিয়ামে দিল্লি ডেয়ার ডেভিলসের হয়ে ডেকান চার্জাসের বিপক্ষে আইপিএলে প্রথম হ্যাট্রিকের দেখা পান অমিত। ডেকান চার্জাসের হয়ে কিংস ইলেভেন পাঞ্জাবের বিপক্ষে দ্বিতীয় হ্যাট্রিকের দেখা পান তিনি । সেই ম্যাচে তার উইকেটের শিকার হন ব্যাটসম্যান ম্যাক্লারেন, মান্দিপ সিং ও রায়ান হ্যারিস । তার চমৎকার বোলিং দক্ষতায় শেষ হ্যাট্রিকটি আসে ২০১৩ সালে সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদের হয়ে পুনে ওয়ারিওর্সের বিপক্ষে । আর সেই হ্যাট্রিকের মাধ্যমে রেকর্ডবুকে তার নাম লিখান ভারতীয় এই লেগি বোলার ।
তথ্যসূত্র : www. sportskeeda. com
আরিফুল ইসলাম সোহান