যুদ্ধ

মার্টিন বোরম্যানঃ হিটলারের নিকটবর্তী কুখ্যাত নাৎসি অপরাধী

যুদ্ধ বুধবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০৪:৩৫:৩৬

২য় বিশ্বযুদ্ধের হলোকাস্টের পর পর শান্তিকামী বিশ্ব একটি বড় ধরণের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়- জার্মান নাৎসি বাহিনীর গণহত্যা পরিচালনাকারী হত্যাকর্তাদের কিভাবে গ্রেপ্তার করে বিচারের সম্মুখীন করা যায়! যাদের অধিকাংশ কর্মকান্ড ছিলো মানবতা ও আন্তর্জাতিক শান্তির বিপরীতে। ন্যুরেমবার্গের আন্তর্জাতিক আদালতকে (The International Military Tribunal (IMT)) এ চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়েছে। ১৯৪৫ সালের ১৮ অক্টোবর এই আদালতের চীফ প্রসিকিউটর ২৪ জন নাৎসি বাহিনীর নেতার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন, এ ২৪ জনের একজন ছিলেন মার্টিন বোরম্যান।

তার জন্ম মধ্য জার্মানির হানবারস্টাডটে ১৯০০ সালের ৭ জুন। বাবা ঘোড় সওয়ার বাহিনীর সার্জেন্ট, পরে বেসামরিক কর্মী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বোরম্যান ছোটবেলায় স্কুলে গিয়েছিলেন কিন্তু পাশ করতে পারেনি।

১ম মহাযুদ্ধে অল্প বয়সেই ৫৫ নম্বর গোলন্দাজ রেজিমেন্টের গোলন্দাজ ছিল। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর বোরম্যানের পদোন্নতি হয়ে বাগিচা ইন্সপেক্টর হয় আর একই সঙ্গে দক্ষিণপন্থী প্রাক্তন সৈনিকদের সংগঠন ফ্রেই কর্পসের রসবাখ- মেকলেনবুর্গ ইউনিটে যোগ দেয়। এরপর থেকে বোরম্যান যেনো অন্যরকম মানুষে পরিণত হয়ে যায়। নিজের জীবনের যত চাহিদা, আকাঙ্খা তা পুরণ করার জন্য উঠে পডে লাগে।

 তার শুরুটা হয় অসউইজের কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের পরিচালক তার বন্ধু রুডলক ফ্রাঞ্জ হোয়েসের সঙ্গে মিলে বোরম্যানের স্কুলের শিক্ষক ওয়ালথার ক্যাডোকে খুন করে। বিচারে হোয়েসের দশ বছর এবং খুনে সহযোগিতা করার জন্য বোরম্যানের এক বছর জেল হয়। জেল থেকে বেরিয়েও থেমে থাকেনি তার জীবন কর্ম, শুরুতেই নাৎসি পার্টিতে যোগ দেয়। ১৯৩৭ সালে থুরিঙ্গিয়া প্রদেশে নাৎসি পার্টির প্রাদেশিক প্রেস অফিসারেও উন্নিত হয়। পরের বছর ডিস্ট্রিক লিডার ও থুরিঙ্গিয়ায় নাৎসি পার্টির চিফ বিজনেস ম্যানেজার আর একই সঙ্গে এস.এস.-এর সুপ্রিম কম্যান্ডার সদস্য, এভাবেই যেনো তার উন্নতি হচ্ছিলো খুব দ্রুত।

নিজের সুবিধার্থেই ১৯২৯ সালে বোরম্যান বিয়ে করে এক জার্মান সংসদ সদস্যের কন্যা গের্ডা বুচকে। ১৯৩০ সালে হিলোফসকাসে নামের এক তহবিলের প্রশাসক হিসেবেও কাজ শুরু করেন। এই তহবিলটি তৈরি হয়েছিলো কমিউনিস্টদের উপর হামলা করতে গিয়ে ঘায়েল হওয়া নাৎসি সদস্যদের সাহায্যে। ধীরে ধীরে বোরম্যান তহবিলের উচ্চপদে উঠলে তহবিলের উপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চলে আসে একমাত্র তার হাতে। বোরম্যান জীবনে এই প্রথম বিশাল তহবিলের বিলি বন্দোবস্ত করতে গিয়ে নিজেও বিপুল ধনী হয়ে উঠে। আর তার এই অভিজ্ঞতা পরবর্তীকালে দারুনভাবে তার সাহায্যে এলো যখন নাৎসি পার্টি ১৯৩৩ সালে ক্ষমতায় আসে। নাৎসি পার্টি ক্ষমতায় এলে 'এডলফ হিটলার স্পেন্ডে' নামক একটি তহবিল করা হয়। আর বোরম্যানের অভিজ্ঞতার জন্য তাকেই সেই তহবিলের সচিব করা হয়।

এই তহবিলে প্রচুর পরিমাণে টাকা আসতো জার্মানির দেশি-বিদেশি পুঁজি-পতিদের কাছ থেকে, এমনকি এ তহবিলে টাকা না দিলে কোন ব্যাবসায়ীরই জার্মানিতে ব্যাবসা চালানোর অনুমতি পাওয়া যেতো না। যদি নতুন ব্যাবসা খুলতে হতো তাতে বোরম্যান নির্দিষ্ট করে দিতো কাকে কত টাকা করে দিতে হবে। এই তহবিলের ঘোষিত উদ্দেশ্য ছিলো- জার্মান দেশপ্রেমিকদের সাহায্য করা। প্রকৃতপক্ষে তহবিলের টাকা ছিলো হিটলারের ব্যাক্তিগত। এর হিসাব নিকাশ হিটলার আর বোরম্যান ছাড়া আর কেউ দেখার অধিকারী ছিলো না, আর হিটলারে বিশ্বাস বোরম্যান সীমাহীনভাবে অর্জন করায় বোরম্যান সেই সুযোগে দিনে দিনে ফুলে ফেঁপে উঠতে থাকলো। ক্ষমতায় আসার পরে হিটলার তাকে ডেপুটি ফুয়েরার রুডলফ হেসের চিফ অব স্টাফ নিযুক্ত করে। তারপর বোরম্যান সেখান থেকে নাৎসি পার্টির রাইখ লিডার হয়ে যান।  ক্রমানুযায়ী নাৎসি পার্টির সাংসদও হয়েছিলেন তিনি।

হিটলার কে খুশি করার
জন্য বোরম্যান ব্রাউনাউ আম ইনের সেই বাড়িটি, যেখানে হিটলার জন্মেছিলো, লিওনডিং এর বাড়িটি যেখানে তার বাবা-মা শেষ জীবন কাটিয়েছিলো আর ওবেরসালজবুর্গের সম্পূর্ণ জমিদারি জাতীয় শ্রদ্ধা নিবেদন স্থল ঘোষণা করে। হেসের ডেপুটি ফুয়েরার পদ বিলোপ করে তার সমস্ত ক্ষমতা বোরম্যানকে দিয়েছিলো হিটলার। দিনে দিনে বোরম্যান হিটলারের সহকারী হয়ে উঠেন। এসব ক্ষমতা পেয়ে বোরম্যান সর্ব শক্তি নিয়োগ করেছিলো এস.এস. আর জার্মান ফৌজের ক্ষমতা খর্ব করতে। বলা হয় বোরম্যানের সঙ্গে গোয়েবেলসের ঠান্ডা যুদ্ধের মুল কারণ দুইজনের পত্নীর সঙ্গে হিটলারের ঘনিষ্ঠতা।  

হিটলারের সাথে ঘনিষ্ঠতা ও তার কাছাকাছি থাকায় বোরম্যানও নাৎসি বাহিনীর হত্যাকর্তা হয়ে উঠে। বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন জার্মানির দেশীয় পলিসি গ্রহণে তার ব্যাপক ভূমিকা দেখা যায় তখন। ইহুদি নিধন ও ইউথানাসিয়া প্রোগ্রাম পরিচালনায় বোরম্যান তার রক্তচোষা রূপ ফুটিয়ে তুলে। এখানে বলে নেই ইউথানাসিয়া প্রোগ্রাম হচ্ছে, জার্মানিতে শারিরীক ও মানসিকভাবে ডিজেবলড বা সুস্থ নয়, যারা জার্মান জাতিগঠনে কোন কাজে আসবে না বলে মনে করা হয়,  তাদেরকে দেশের বোঝা মনে করে তাদের শান্তিদায়ক মৃত্যুপ্রদানের একটি প্রোগ্রাম। তাদের বাসা থেকে ধরে একটা নির্দিষ্ট স্থানে চিকিৎসার নাম করে নিয়ে গিয়ে রক্তের সাথে বিষজাতীয় পদার্থ মিশিয়ে হত্যা করা হতো।  ইহুদি হত্যার পাশাপাশি ইহুদিদের নির্বাসিত করতে উঠেপডে লাগে বোরম্যান। ইহুদি শ্রমিকদের জোর পূর্বক শ্রমিক হিসেবে খাটানোর ক্ষেত্র গুলোকে আরো বেশি প্রসারিত করেন এই বোরম্যান।

হিটলার মারা যাওয়ার পর
বোরম্যানও উধাও হয়ে যায়। পরে বিভিন্ন জায়গায় তাকে দেখা যাওয়ার খবর পাওয়া গেলেও তা ভিত্তিহীন বলে প্রমাণিত হয়। ন্যুরেমবার্গ বিচারে বোরম্যানকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় তার অনুপস্থিতিতেই। কিন্তু ১৯৭৩ এর এপ্রিল হিটলারের বাঙ্কার থেকে মাত্র আধ মাইল দূরে ওয়াইডেন হ্যামার ব্রিজ আর বার্লিনের লেহরধার স্টেশনের প্রায় মাঝামাঝি এক কঙ্কালের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেলে পশ্চিম জার্মানির এক আদালত তাকে খোঁজার সমস্ত চেষ্টার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। ভিয়নার যুদ্ধাপরাধী ডকুমেন্টেশন কেন্দ্রের অধিকর্তা সাইমন ওয়াইজেনথাল অবশ্য ঘোরতর সন্দেহ প্রকাশ করে বলেছিলেন যে হাড়গুলি পাওয়া গেছে, যদিও সেগুলি যে বোরম্যানেরই তার কোন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

তথ্যসূত্রঃ   

নাৎসি বিরোধী জার্মান বীরত্ব কথা- সুবর্ণ হাজরা

https://encyclopedia.ushmm.org/content/en/article/martin-bormann

https://en.wikipedia.org/wiki/Martin_Bormann
লেখকঃ এস এম সজীব