যুদ্ধ

হিটলারের ক্ষমতার দিনগুলিতে তার বিরোধীতা করা সাহসী মানুষেরা।

যুদ্ধ শুক্রবার, ৩০ আগস্ট ২০১৯ ০২:০৮:১৭

হিটলার ১৯৩৩ সালে ক্ষমতাগ্রহণের পর থেকে জার্মানিতে তার নিজস্ব রাজত্ব তৈরি  করে নেন। ইহুদি নিধন,  গণহত্যা, এমনকি ইহুদি বিতাড়ন করে জার্মানিকে ইহুদি মুক্ত করা তার লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মত পরিস্থিতি তৈরি করে চারদিকে হত্যাযজ্ঞ চালানোর পরেও হিটলারের বিরুদ্ধে জার্মানিতে কেউ কথা বলার সাহস পেতো না। তবুও যে হিটলারের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে কিছু মানুষ, কিছু সংগঠন কথা বলেনি এমন নয়, এমনকি অনেকে সাহস দেখিয়ে হিটলারকে খুন করতেও চেষ্টা করেছেন। যদিও তার অধিকাংশকেই মৃত্যুদণ্ডে দন্ডিত হয়েছে, তবুও প্রাণের ভয় নিয়েই অনেক মানুষ প্রতিবাদ করেছিলেন। বলছি এমন কিছু মানুষ ও সংগঠনের কথা-

ওল্ফস লেয়ারের হিটলারকে হত্যা চেষ্টাঃ
হিটলারকে হত্যা কিংবা প্রতিরোধ করার যে চেষ্টাগুলো করা হয়েছিলো তন্মধ্যে খুব শক্তিশালী পরিকল্পনা ছিলো ওলস লেয়ারে।  এখানে হিটলারকে হত্যার মূল পরিকল্পনাকারীদের একজন ছিলেন ক্লাউস গ্রাফ শেঙ্ক ফন স্টাফেনব্যার্গ৷ ১৯৪২ সালে স্টাফেনব্যার্গ বুঝতে পেরেছিলেন জার্মানির পক্ষে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ জেতা সম্ভব নয়৷ তাই জার্মানিকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে তিনি হিটলার সরকারকে উৎখাত করতে চেয়েছিলেন৷ হিটলারকে হত্যা করতে ১৯৪৪ সালের ২০ জুলাই তাঁর ‘ওল্ফস লেয়ার’ সদর দপ্তরে বোমা হামলা চালানো হয়েছিল৷ কিন্তু নির্ধারিত সময়ের আগে বৈঠক করে ফেলায় বোমা ফাটলেও  ভাগ্যক্রমে বেঁচে গিয়েছিলেন হিটলার৷ তবে চারজন নিহত হয়েছিলেন৷ হামলার সঙ্গে কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান সেনা কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন৷ পরবর্তীতে তাদের মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়৷

দ্যা ক্রাইসউয়ার সার্কেলঃ
জার্মান রাজনীতিতে মৌলিক পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে ‘ক্রাইসউয়ার সার্কেল’ গঠন করা হয়েছিলো৷ হিটলারের ইহুদিদের গণহত্যা ও তাদের দেশান্তরের নির্মমতার ফলে এ সংগঠন সক্রিয়ভাবে কাজ করার চেষ্টা করেন।  হেলমুট জেমস গ্রাফ ফন মল্টকে এবং পেটার গ্রাফ ইয়র্ক ফন ভার্টেনবুর্গ এই আন্দোলনের পেছনের মূল মানুষ ছিলেন৷ ‘ক্রাইসাউয়ার সার্কেল’-এর কয়েকজন কর্মীও ১৯৪৪ সালের ২০ জুলাই ওল্ফস লেয়ারে  হিটলার হত্যা পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন৷  তাঁদেরও পরে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিলো৷

হোয়াইট রোজঃ

হিটলারের বিরুদ্ধে শব্দ করার সাহস তখন খুব কম মানুষের হয়েছিলো। হিটলারের বিরুদ্ধে কথা বলতে গেলেই নাৎসি বাহিনীর নির্মম অত্যাচার এমনকি হত্যার শিকার হতে হতো। এমন দুসময়েও হান্স ও সোফি শোল - এই দুই ভাই-বোনের নেতৃত্বে ১৯৪২ সালে মিউনিখের একদল শিক্ষার্থী হিটলার সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন৷ ‘হোয়াইট রোজ’ নামে গড়ে তোলা তাঁদের গ্রুপ নাৎসি আমলের অপরাধের সমালোচনা করে হাজার হাজার লিফলেট বিতরণ করেছিলো৷ হিটলারের অপকর্মের বর্ণনা ও বর্বরতার চিত্র লিফলেটে তুলে ধরেন তারা। ১৯৪৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে এই দুই ভাই-বোনকে গ্রেপ্তার করে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়৷

কাঠমিস্ত্রি গেওর্গ এলসারঃ

হিটলারের ঘৃণিত কর্মকান্ডের প্রতিবাদ মানুষ মুখে কিংবা রাজপথে দেখাতে না পারলেও কয়েকজন সাহসী ব্যক্তি হিটলারের বিরুদ্ধে নিজ নিজ জায়গা থেকে যেভাবে সম্ভব দাড়িয়েছিলেন। এদের অনেকে হিটলারকে সরাসরি খুনও করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তাতো আর অত সহজ নয়। এরকম একদিন সুযোগ মেলে যায় কাঠমিস্ত্রি গেওর্গ এলসার এর তার সুপ্ত ইচ্ছা পূরণের।  ১৯৩৯ সালে মিউনিখের এক জায়গায় হিটলারের বক্তব্য দেয়ার কথা ছিলো৷  এর স্টেজ তৈরির দায়িত্ব পান কাঠমিস্ত্রি গেওর্গ এলসার। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে এলসার সেখানে একটি বোমা রেখেছিলেন৷ তবে যখন বোমাটি ফেটেছিল ততক্ষণে হিটলার বক্তব্য শেষ করে ঐ জায়গা থেকে চলে গিয়েছিলেন৷ তবুও এই বোমা বিস্ফোরণে সাতজন প্রাণ হারিয়েছিলেন, আহত হয়েছিলেন ৬০ জন৷ এলসারকে সেদিনই গ্রেপ্তার করে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো। ১৯৪৫ সালে সেখানে তাঁর মৃত্যু হয়৷

শিল্পী ও বুদ্ধিজীবী  প্রতিবাদঃ

হিটলার ১৯৩৩ সালে ক্ষমতায় আসার পর অনেক শিল্পী ও বুদ্ধিজীবী তার প্রতিবাদ করেছেন৷ পরবর্তীতে সেসব শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীদের অনেককে ভয়ে দেশ ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিলো৷ হিটলার যখন চারদিকে বর্বর হত্যাকান্ড শুরু করেন তখন দেশে বিদেশে থাকা শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীরা তাদের লেখালেখিতে, বক্তৃতায় হিটলারের এমন কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করেন। জার্মানিতে যারা ছিলেন তারাও নানানভাবে হিটলারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার চেষ্টা করতেন, কিন্তু অধকাংশ সময়েই তারা মৃত্যু ভয়ে মুখ খুলতে পারতেন না। এমন সময়ে হিটলার বিরোধিতাকারী একটা বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠী ‘কাটাকম্ব’। তারা হিটলার প্রশাসনের বিরোধিতা করেছিলেন, প্রচার করেছিলান হিটলার বিরোধী মতবাদ৷ ফলশ্রুতিতে ১৯৩৫ সালে তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হয় এবং এর প্রতিষ্ঠাতা ভ্যার্নার ফিঙ্ককে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেয়া হয় নির্যাতনের জন্য ৷

তরুণদের প্রতিবাদঃ

হিটলার আমলে জার্মান তরুণ-তরুণীদের একটি অংশ যুক্তরাষ্ট্রের জীবন যাপন রীতির প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন৷ তাঁরা সুয়িং ড্যান্স ও সংগীতের ভক্ত ছিলেন৷ এই তরুণরা ‘ডি সুয়িং ইয়োগেন্ড’ বা সুয়িং ইয়থ নামে একটি গ্রুপ গড়ে তুলেছিলেন৷ তারাও বিভিন্ন সময় নাৎসি আমলের বিরোধিতা করেছেন৷ ফলে তাঁদের অনেককে গ্রেপ্তার করে তরুণদের জন্য গড়ে তোলা কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে পাঠানো হয়েছিল৷

'রটে কাপেলে’ গ্রুপঃ

নাৎসি শাসকদের অপরাধের তালিকা তৈরি করতে ইহুদিদের সহায়তা করত ‘রটে কাপেলে’ নামে একটি গ্রুপ৷ নাৎসিদের অপরাধ সমূহ তারা লিফলেটে লিখে  বিতরণও করতো সাধারণ মানুষের কাছে৷ এ কারণে ১৯৪২ সালে এই গ্রুপের ১২০-এর বেশি ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিলো৷ এর মধ্যে পঞ্চাশের বেশি ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়৷

লেখকঃ এস এম সজীব