যুদ্ধ

বিশ্বযুদ্ধ জয়ে হিটলারের নানাবিধ পরিকল্পনা।

যুদ্ধ বৃহস্পতিবার, ০৭ মার্চ ২০১৯ ১২:১৪:৪৭

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রহস্য, ঘটনা কোনকিছুরই শেষ নেই। এই বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে  শতশত বই রচনা হলো, সিনেমা-ডকুমেন্টরি বানানো হলো, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। এর নেতৃত্বে ছিলো হিটলার তার নাৎসি বাহিনী। হিটলার সম্পূর্ণভাবে ইহুদি নিধন ও বিশ্বযুদ্ধ জয়ে ছিলেন বদ্ধপরিকর। এই যুদ্ধ জয়ে হিটলার ও তার বাহিনী নানান অদ্ভুত ও  বিচিত্র রকমের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন হিটলারের নানান বিচিত্র রকমের পরিকল্পনার কিছু পরিকল্পনার কথা তুলে ধরছি, যেগুলো হিটলার বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিলেন।

চকলেটের মাধ্যমে ড্রাগঃ  
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুতে জার্মানি আক্রমনের সফলতা ছিলো অত্যাধিক মাত্রায়। প্রথমদিকে জার্মান সেনাবাহিনী সফলতার সাথে অনেকগুকো আক্রমন চালাতে সক্ষম হউ। এ সফলতা জার্মানের শুধুমাত্র নাৎসি বাহিনীর যুদ্ধকৌশলে নয়, এ সফলতার পেছনে লুকিয়ে আছে অন্তর্নিহিত ড্রাগ। যে ড্রাগ সেবনে সেনাদের শরীরের কার্যক্ষমতা অত্যাধিক মাত্রায় বেড়ে যেতো।

ড্রাগটি আবিষ্কারের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উপর প্রথমে এর পরীক্ষা করে দেখা হয়। সেখানে  সন্তোষজনক ফলাফল পেলে নাৎসি বাহিনী তাদের প্রত্যেক সৈন্যের জন্য এ ড্রাগটি সরবরাহের নির্দেশ দেয়। এ ড্রাগের প্রভাবে সেনারা ক্লান্তিহীনভাবে দীর্ঘ সময় একটানা কাজ করে যেতে পারতো। পাশাপাশি মানসিকতার পরিবর্তনের ফলে বিভিন্ন বড় ধরনের ঝুঁকি নিতেও তারা পিছপা হতো না, যা কিনা স্বাভাবিক অবস্থায় অনেকে না-ও করতে পারতো। পরবর্তী সময়ে স্বাদ বৃদ্ধির জন্য ড্রাগটির চারদিকে চকলেট বা ক্যান্ডির আস্তরণ দেয়া হয়।

পার্ভিটিন ড্রাগটি  জার্মান সেনাদের সাময়িক সফলতা এনে দিলেও এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ছিলো ভয়াবহ। অনেক সেনাই এতে ধীরে ধীরে আসক্ত হয়ে পড়ে। এ আসক্তি থেকে তারা মাত্রাতিরিক্ত মদ্যপান শুরু করে দেয়। নিদ্রাহীনতার সমস্যা কাটাতে তারা আফিমযুক্ত মাদক সেবন শুরু করে দেয়, ফলে তাদের চোখ থেকে একরকম ঘুম হারিয়ে যেতো। মিত্র বাহিনীকে ঠেকাতে ১৯৪৪ সাল নাগাদ নাৎসি বাহিনী আরো ভয়াবহ মাত্রার ড্রাগের দিকে ঝুঁকে পড়ে। পার্ভিটিন, মরফিন আর কোকেন মিশিয়ে তারা তৈরি করেছিলো  আরেকটি ড্রাগ। সেই ড্রাগের জন্য গিনিপিগ বানানো হয়েছিলো জেলখানার বন্দীদের। পরীক্ষার ফলাফল ছিলো আশাতীত। ড্রাগটি ব্যবহারের পর বন্দীরা অতিমানবীয় শক্তি ও সহনক্ষমতা দেখিয়েছিলো। মিত্র বাহিনী যদি জার্মানিতে সফলতা না পেতো, তাহলে যে দেশটিতে এর উৎপাদন বেশ ভালোভাবেই শুরু হতো, তা বোধহয় আর না বললেও চলে।

অ্যঙ্গোরা খরগোশ পরিচর্যাঃ
“এসএস যে অ্যাঙ্গোরা খরগোশগুলো পোষা প্রাণী হিসেবে পালতো, মথসেনের (একটি কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প) সবচেয়ে ভালো খাবারদাবার পাওয়া জীব ছিলো সেগুলোই।” দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পগুলোতে বন্দীদের উপর কত রকম ভয়াবহ নির্যাতন চালানো হয়েছে, তা অনেকেরই জানা। সেখানে তারা যেন মানুষ ছিলো না, ছিলো গিনিপিগ। তাদের সাথে নাৎসি বাহিনীর সৈন্যদের ব্যবহার, সরবরাহকৃত খাদ্যের অপ্রতুলতা, অত্যাচার, বিভিন্ন গবেষণাতে তাদের ব্যবহারের ইতিহাসগুলো পড়লে এটা ভাবতে বাধ্য হবে যে কেউই।


আশ্চর্যজনক ব্যাপার হলো, যখন মানবতা সেখানে ধুলোয় লুটিয়ে পড়ছিলো, তখনও পশুর প্রতি নাৎসি বাহিনীর মমতা ছিলো দেখার মতো। সেখানে ভূমিকা পাল্টে গিয়েছিলো; মানুষ যেন হয়ে গিয়েছিলো পশু, আর পশু হয়েছিলো মানুষের মতোই মর্যাদাসম্পন্ন! বলা হচ্ছিলো প্রজেক্ট অ্যাঙ্গোরার কথা। হাইনরিখ হিমলারের নির্দেশে এসএস-এর অধীনে হাজার হাজার বন্দীকে নিয়োজিত করা হয়েছিলো বৃহদাকার অ্যাঙ্গোরা খরগোশ পরিচর্যার কাজে। বড়সড় এ খরগোশগুলোকে পরিচর্যার পেছনেও অবশ্য সামরিক বাহিনীর সাথে সংশ্লিষ্ট উদ্দেশ্য ছিলো। এ খরগোশগুলোর পশম সংগ্রহ করে পরবর্তীতে সামরিক বাহিনীর সদস্যদের কোটে ব্যবহার করা হতো। পাশাপাশি অনেক অফিসার শখের বশে সেসব খরগোশ পালতেনও।

কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পগুলোতে খরগোশগুলো কেমন রাজকীয় হালে আর মানুষেরা অতটা অবর্ণনীয় অবস্থায় জীবনযাপন করতো, তা ভাবলেও আশ্চর্য হতে হয়। অনাহারে-অর্ধাহারে থেকে যখন বন্দীরা মৃত্যুবরণ করতো, তখন খরগোশগুলোর খাদ্য তালিকায় স্থান পেত নানা পুষ্টিকর খাবার-দাবার।

লেবেন্সবর্নঃ
হিটলার সবসময় চেয়েছিলেন আর্য জাতিদের নিয়ে এক বিশুদ্ধ জার্মানি গড়তে। আর্য তারাই, যারা সাদা চামড়া, স্বর্ণকেশী, নীল চোখের অধিকারী এবং শারীরিকভাবে শক্তিশালী। হিটলারের প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল—ইউরোপিয়ান ইহুদি, সমকামী, মানসিক রোগী ও শারীরিক প্রতিবন্ধীদের নির্মূল করে একটি বিশুদ্ধ জার্মানি তৈরি করা; যেখানে কেবল আর্য জাত কর্তৃত্ব করবে। এই পরিকল্পনা সার্থক করার উদ্দেশ্যে হিটলারের গ্যাস চেম্বার তৈরি এবং ব্যাপক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা তো সবাই জানে।
এই তথাকথিত ‘বিশুদ্ধ’ জার্মানি গড়ার লক্ষ্যে হিটলার বেশ কিছু সংখ্যক আর্য মেয়েদের বিলাসবহুল প্রাসাদে বড় করার কর্মসূচি নেন। তিনি এর নাম দিয়েছিলেন ‘লেবেন্সবর্ন প্রোগ্রাম। প্রাথমিকভাবে নাৎসি বাহিনীকে আদেশ দেওয়া হয়েছিল অধিকৃত এলাকা, যেমন—পোল্যান্ডের নারীদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার।লেবেন্সবর্ন প্রোগ্রামে আসা অবিবাহিত নারীদের শয্যাসঙ্গী হতো বিভিন্ন বিবাহিত এসএস অফিসার। তবে এটি ছিল বেশ গোপনীয় একটি প্রোগ্রাম। তাই এখানে অংশ নেয়া প্রত্যেক পুরুষেরই পরিচয় গোপন রাখা হয়, একই কথা নারীদের বেলাতেও প্রযোজ্য। লেবেন্সবর্ণে জন্ম নেয়া মা ও শিশুকে এরপর বিলাসবহুল প্রাসাদে স্থানান্তরিত করা হয়।


এ প্রক্রিয়া ছিল খুবই ধীরগতির। একটি নতুন ব্যাচ পেতে অনেক সময় লেগেছিল। এ কারণে নাৎসিরা বাধ্য হয়ে সেসব শিশুকে তাদের মা-বাবার কাছ থেকে অপহরণ করে। ১৯৪৫ সালে বন্ধ হবার আগপর্যন্ত আনুমানিক ৮,০০০ শিশুর জন্ম হয়েছিলো শুধুমাত্র জার্মান লেবেন্সবর্ন প্রজেক্টকে কেন্দ্র করে।

সাইকোপ্যাথ ইরমা গ্রিজঃ
ইরমা গ্রিজের নিষ্ঠুরতা ও পৈশাচিকতা কল্পকাহিনীকেও হার মানায়। ইরমা গ্রিজের জন্ম জার্মানির রেচেন শহরে ১৯২৩ সালে। ১৯৪২ সালে তিনি নাৎসি বাহিনীতে যোগ দিয়ে ক্রমান্বয়ে ‘অসউইজ কনসেনট্রেশন ক্যাম্প’- এর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদাধিকারী মহিলা গার্ড হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। ইরমা বন্দিদের ভিন্ন ভিন্ন ভয়ংকর সব উপায়ে যন্ত্রণা দিয়ে আনন্দ পেতেন। তার দায়িত্বগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল গ্যাস চেম্বারে মৃত্যুদণ্ডের জন্য বন্দি বাছাই করা।


ইরমা সব সময় নিজের সঙ্গে দুটি ক্ষুধার্ত কুকুর রাখতেন। তার ছিল ধারালো পেরেকযুক্ত একটি বেল্ট, যেটি দিয়ে বন্দিদের অনবরতই পেটাতেন। ইরমার এই নৃশংসতার কথা খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, যা তাকে ‘অসউইজ-এর হায়েনা’ নামে কুখ্যাতি এনে দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে, ইরমা গ্রিজকে তার নির্মমতার জন্য মাত্র ২২ বছর বয়সে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়।

অপার্থিব ক্ষমতাঃ
নাৎসি বাহিনীর উচ্চপদস্থ অনেক কর্মকর্তাই জড়িত ছিলেন নানা গুপ্ত সংঘের সাথে। অনেকে তাদের সামরিক বাহিনীর সফলতার জন্য সেসব লোকদের শরণাপন্ন হতেন। এদের মাঝে সবচেয়ে বিখ্যাত ছিলেন ভিলহেল্ম উলফ, লুডভিগ স্ত্রানিয়াক এবং ভিলহেল্ম গুতবেরলেত। তাদের তিনজনের ছিলো তিন রকমের অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা।
ভিলহেল্ম উলফ ছিলেন একজন জ্যোতিষী। তাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিলো ইতালীয় একনায়ক বেনিতো মুসোলিনিকে খুঁজে বের করার জন্য, যিনি তখন প্রতিপক্ষের হাতে বন্দী ছিলেন। বলা হয়, তাকে দেয়া কাজটি নাকি আধ্যাত্মিক ক্ষমতাবলে ঠিকমতোই সম্পন্ন করেছিলেন তিনি।
লুডভিগ স্ত্রানিয়াক পেশায় ছিলেন একজন স্থপতি। নরওয়ের জলসীমার কাছে গোপন মিশনে থাকা জার্মান ব্যাটলশিপ দ্য প্রিন্স ইউজেনের অবস্থান সঠিকভাবেই তিনি অনুমান করেছিলেন।
এই তিনজনের মাঝে সবচেয়ে বেশি ভয়াবহ ছিলেন ভিলহেল্ম গুতবেরলেত, পেশায় যিনি ছিলেন একজন চিকিৎসক। হিটলারের একেবারে শুরুর দিককার অনুসারীদের মাঝে তিনি ছিলেন একজন। গুতবেরলেতের ব্যাপারে বলা হয়, তিনি নাকি ইহুদীদের অস্তিত্ব অনুধাবন করতে পারতেন; এমনকি যদি সেই লোকটি কোনো ভিড়ের মাঝেও থাকতো, তবুও তার সেই ‘কাজ’ কিংবা ‘ক্ষমতা’র পথে সেটা কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াত না! এজন্যই হিটলার তার উপর নির্ভরশীল ছিলেন।

লেখকঃ উবায়দুর রহমান রাজু